ভোক্তা ও কৃষকের স্বার্থে চিনি শিল্পের সংস্কার প্রয়োজন

নিতাই চন্দ্র রায়

বকেয়া পরিশোধ,  আখের মূল্যবৃদ্ধিসহ  বিভিন্ন দাবিতে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় প্রেস কাবের সামনে মানববন্ধন করেন  রাষ্ট্রায়াত্ত ১৫টি চিনি কলের আখ চাষিরা । চাষিরা তাদের ২০০ কোটি টাকার পাওনা পরিশোধ এবং প্রতিমণ আখের দাম ১৫০ টাকা নির্ধারণসহ ১১ দফা দাবি জানান। মানববন্ধনে বাংলাদেশ চিনিকল আখচাষি ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধান বলেন,‘ কৃষি ও জাতির স্বার্থে বঙ্গবন্ধু চিনিকল জাতীয়করণ করার পর এ শিল্প লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। কিন্তু পরবর্তিতে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, কর্মচারিদের কারণে এ শিল্প লোকসানের পথে চলে যায়। বেসরকারিভাবে চিনিকল গড়ে উঠলে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি।’ অপর দিকে আখ চাষি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী বাদশা বলেন, ‘চিনি শিল্প করপোরেশনের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য কর্মকর্তা, কর্মচারিদের কারণে গত তিন বছরে উৎপাদিত চিনি অবিক্রিত অবস্থায় গোডাউনে পড়ে থেকে গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। ফলে চিনিকলগুলো লোকসানের মুখে পড়েছে আর চাষিরা মানবেতর জীবনযাপন করছে।’   চিনিকলে আখ সরবরাহের তিন দিনের মধ্যে আখের মূল্য পরিশোধের রেওয়াজ থাকলেও আখ সরবরাহের তিন/চার মাস  অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও চাষিরা এবার আখের মূল্য পাচ্ছেন না। মূল্য না পাওয়ায় চাষিরা রোপণকৃত আখের পরিচর্যা করতে পারছেন না। আখের মূল্যের জন্য চাষিরা প্রতিদিন মিলে এসে ভীড় করছেন এবং টাকা না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। এতে মিল কর্তৃপক্ষের সাথে আখ চাষিদের সম্পর্কের  অবনতি ঘটছে; আখ চাষের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হচ্ছে। এমনিতেই আখ একটি দীর্ঘ মেয়াদী ফসল। রোপণ থেকে মাড়াই পর্যন্ত ১২ – ১৪ মাস সময় লাগে। এই সময়ে আমন ধান, আলু ও ভূট্টার মতো তিনটি ফসল চাষ করে অধিক অর্থ আয় করা  যায়। তারপরও যদি সময় মতো  আখের মূল্য না পাওয়া যায়, তবে আখ চাষে চাষিদের আগ্রহ হ্রাস পাওয়াই স্বাভাবিক। গত তিন বছরে ধান, গম ও ভূট্টাসহ অন্যান্য ফসলের দাম বাড়লেও আখের দাম এক টাকাও বাড়ানো হয়নি।

 

অন্য দিকে আখ উৎপাদন উপকরণ, শ্রমিকের মজুরি ও আখ পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে অনেক। এসব কারণে আখ চাষ বর্তমানে অলাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় মতো আখের মূল্য না পাওয়ায় এবছর ১৫ টি চিনিকল এলাকায় আখের চাষ গত বছরের চেয়ে কম হয়েছে। তাই আগামী মাড়াই মৌসুমে আখের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আখ চাষি প্রতিনিধিগণ যাই বলুন না কেন, চিনি বিক্রি এবং সময় মতো আখের মূল্য প্রদানের বিষয়টি শুধু করপোরেশন বা চিনিকল কর্তৃপরে ওপর নির্ভর করেনা। এটি একটি  জাতীয় সমস্যা এবং নীতি নির্ধারণের ব্যাপার। এর সমাধান সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে। এর সাথে বহু বিষয় জড়িত রয়েছে। বিষয়গুলি হলো -দেশে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনির অবাধ আমদানি। চোরাই পথে ভারতীয় চিনির অনুপ্রবেশ, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনির ওপর তুলনামূলকভাবে কম আমদানি শুল্ক আরোপ, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে বেসরকারি পরিশোধন কারখানা কর্তৃক চিনি বিক্রয়। বিদেশে চিনি রফতানি এবং নগত সহায়তা প্রদান প্রভৃতি বিষয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ৪৬০ টি চিনি কলে এ বছর ২কোটি ৩১ লাখ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়েছে। ভারতে বার্ষিক চিনি ব্যবহারের পরিমাণ  ২ কোটি ২০ লাখ   টন। ফলে সেখানেও উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রয় মূল্য কম হওয়ায় চিনিকলগুলিতে মজুদ বেড়ে যায়। সংকটের সম্মুখীন হয় চিনি শিল্প। চিনিকলগুলি আর্থিক সংকটের কারণে চাষিদের আখের মূল্য পরিশোধে  হিমসিম খাচ্ছিলো। ভারত সরকার আখ চাষিদের স্বার্থে  চিনি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদপে গ্রহণ করে। ইন্ডিয়ান সুগার মিলস্ অ্যাসোসিয়েশনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার সুগার আমদানির ওপর আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করে। গত তিন বছরে চিনিকলগুলি অবগারি শুল্ক বাবদ সরকারের কোষাগারে যে ৬ হাজার ৬০০ কোটি রুপি জমা দেয়। ওই ৬ হাজার ৬০০ কোটি রুপি চিনিকলগুলিকে বিনা সুদে ৫ বছরের জন্য ঋণ হিসেবে প্রদানের এবং চিনি রফতানির ওপর প্রতি টনে ৩ হাজার ৩০০ রুপি নগদ সহায়তা প্রদানের  সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে  কেন্দ্রীয় সরকার। ফলে চিনির দাম ও চিনি  রফতানি বৃদ্ধি পায় এবং এর সুফল ভোগ করতে শুরু করে সেদেশের কোটি কোটি আখ চাষি, মিল মালিক ও শ্রমিক কর্মচারীগণ। অপর দিকে পাকিস্তান সরকার চিনি রফতানির অনুমতি দেওয়ার সাথে সাথে সেদেশে চিনির দাম কেজি প্রতি ৭ টাকা বেড়ে যায়। বর্তমানে পাকিস্থানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি চিনি ৫৪ টাকা এবং খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনি ৫৯ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

 

রফতানি ছাড়াও চিনিকলগুলি থেকে সরকারিভাবে চিনি ক্রয় করায় পাকিস্তানে আখ চাষিও চিনি শিল্পের সমস্যা লাঘব হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও  এতো কম দামে চিনি বিক্রির নজির নেই। ভারতে গত ১৫ এপ্রিল পাইকারি বাজারে এস ও এম গ্রেড চিনি বিক্রি হয়েছে প্রতি কুইন্টাল ৩ হাজার ৯০ থেকে ৩ হাজার ১৪০ রুপিতে। ওই সময়ে বম্বে সুগার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের স্পট মার্কেটে প্রতি কুইন্টাল এস ও এম গ্রেড চিনির দাম ছিল ৩ হাজার ২৩২ থেকে ৩ হাজার ৩৮০ রুপি। সে হিসেবে বাংলাদেশে প্রতি কেজি চিনি দাম হওয়া উচিত কম পক্ষে ৫০ টাকা। বিশ্বস্ত সূত্র থেকে  জানা যায়, এখন  টন প্রতি সর্বনিম্ন ৫১০ দশমিক ২০ ডলারে র-সুগার শুল্কায়ন করছে চট্টগ্রাম কাষ্টম হাউজ। সে হিসেবেও পরিশোধন এবং পরিবহন খরচ ৩ থেকে ৪ টাকাসহ প্রতি কেজি চিনির দাম কম করে হলেও ৪৫ টাকা হওয়া উচিত। অথচ র-সুগার থেকে উৎপাদিত চিনি বাংলাদেশে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩৯ টাকা কেজিতে। তা হলে কীভাবে বিক্রি হবে দেশের ১৫ টি চিনি কলে আখ থেকে উৎপাদিত চিনি? আর কীভাবেই বা বাঁচবে দেশের আখ চাষি ও চিনি শিল্প? আমরা বিদেশ থেকে প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ লাখ টন সুগার আমদানি করে পরোভাবে থাইল্যান্ড, ব্রাজিল ও ভারতের চাষিদের আখচাষে উৎসাহিত করছি, আর দেশে দুই মৌসুমে উৎপাদিত মাত্র ২.২৭ লাখ টন চিনি বিক্রি না হওয়ায় আখ চাষিরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আমরা কি প্রতিবেশি চিনি উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাছ থেকেও কিছু শিখতে পারি না? ট্যারিফ কমিশনের মতে দেশে বার্ষিক চিনির চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন। চট্টগ্রাম কাষ্টমের তথ্য অনুসাওে চলতি অর্থ বছরের এপর্যন্তদেশে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত চিনি  আমদানি করা হয়েছে। কার স্বার্থে এতো বিপুল পরিমাণ চিনি আমদানি করা হলো? দেশে রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন ১৫ টি চিনিকলের চলতি বছর ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত চিনি মজুদের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ২৬ হাজার ৬২০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চলতি ২০১৩-১৪ মাড়াই মৌসুমে উৎপাদিত চিনির পরিমাণ  এক লাখ ২৬ হাজার ৬২০ মেট্রিক টন।  বাকি চিনি গত দুই মৌসুমের । মজুদ থাকা চিনির মূল্য  এক হাজার ২০০কোটি টাকা।  চিনির এই বিশাল মজুদ থেকে এ অর্থ বছরের সাড়ে নয় মাসে সেনা ও নৌবাহিনী, পুলিশ এবং বিজিবি রেশন খাতে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৩ হাজার মেট্রিক টন। এই সময়ে করপোরেশন নিয়োজিত ৪০০ ডিলারের মধ্যে একজনও লোকসানের ভয়ে কোনো চিনি উত্তোলন করেননি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতিটন পরিশোধিত চিনি আমদানিতে অতিরিক্ত একহাজার ৫০০ এবং অপরিশোধিত চিনিতে ৫০০ টাকা শুল্ক নির্ধারণ করার পরও বেসরকারি মিল মালিকদের চিনির দাম বাড়েনি; বরং আরো কমেছে । জানা যায়,  শুল্ক বাড়ানোর পর থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র একহাজার ১০০টন চিনি বিক্রি হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে চার বারে চিনির দাম ৬০ টাকা থেকে ৪০ টাকায় কমানোর পরও চিনি বিক্রি হচ্ছেনা। দেশের ১৫ টি চিনি কলে চিনি রাখার কোনো জায়গা নেই। আগামী মাড়াই মৌসুমে কোথায় চিনি মজুদ রাখা হবে, এনিয়ে মিলকর্তৃপ ভীষণ দুঃচিন্তায় আছে।  চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি চিনির উৎপাদন খরচ পড়েছে ৭৭ টাকা। চিনির দাম ৪০ টাকায় নির্ধারিত হওয়ায় করপোরেশনকে প্রতি কেজি চিনিতে ৩৭ টাকা লোকসান গুণতে হবে। দেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে গ্রামীণ অর্থনীতি চিনি শিল্পের ওপর নির্ভর শীল। দেশীয় এই শিল্পকে টিকিয়ে  রাখতে হলে চিনি বিক্রির ব্যাপারে এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সেই সাথে অনতিবিলম্বে আখ চাষিদের বকেয়া আখের মূল্য পরিশোধ করে রোপণ মৌসুম শুরু হওয়ার পূর্বেই অন্যান্য ফসলের মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আখের মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা প্রদান করতে হবে । এছাড়াও চিনি শিল্পের স্বার্থে সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পদক্ষেপগুলি হলো- ১. গত পাঁচ বছরে চিনি কলগুলি কর্তৃক প্রদেয় সমুদয় ভ্যাট ও আবগারি শুল্কের সমপরিমাণ অর্থ চিনি কলগুলিকে পাঁচ বছরের জন্য বিনা সুদে ঋণ প্রদান করতে হবে। ২. সরকারি ১৫ মিলে উৎপাদিত সমুদয় চিনি সরকারকে ক্রয় করে রোজার আগেই টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রয় করতে হবে। ৩. দেশের চাহিদার ওপর লক্ষ্য রেখে চিনি উৎপাদন মৌসুমে ২ থেকে ৩ মাস  বিদেশ থেকে সকল প্রকার চিনি আমদানি বন্ধ/নিয়ন্ত্রণ  করতে হবে। ৪. প্রয়োজনে অপরিশোধিত চিনির ওপর আমদানি শুল্ক আরো বাড়াতে হবে। ৫. বিদেশে চিনি রফতানির ব্যাপারে ভারত সরকারের মতো নগদ সহায়তা প্রদান করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই দেশের কৃষিভিত্তিক রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোকে দেউলিয়া করে একচেটিয়া চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে আমদানির চেয়েও কমদামে বাজারে চিনি বিক্রি করা হচ্ছে। চিনিকলগুলো দেউলিয়া করার অপচেষ্টা সফল হলে ভবিষ্যতে সিন্ডিকেট করে প্রতি কেজি চিনি ১০০ টাকা মূল্যে বিক্রি করা হবে। এতে ভোক্তা, আখ চাষি এবং দেশের স্বার্থ  চরমভাবে ব্যাহত হবে।

 

লেখকঃ

ডিজিএম (সম্প্রঃ)

সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস্ লিঃ, সেতাবগঞ্জ দিনাজপুর, মোবাইল:০১৭২২৬৯৬৩৮৭

ই-মেইল: netairoy18@yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *