মরিচের রোগ বালাই দমনে করণীয়

কৃষিবিদ ড. এম এ মজিদ মন্ডল

 

বাংলাদেশে মসলাজাতীয় ফসলের মধ্যে মরিচের অবস্থান প্রথম সারিতে; কারণ মরিচ ছাড়া সভ্য সমাজে এমন কোন তরকারী নাই যে খাওয়া সম্ভব। এ প্রয়োজনীয় মসলাটি বাংরাদেশে প্রচুর পরিমানে চাষ হয়, তবু দেশের চাহিদা মিটানোর জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। উদ্ব্যানতাত্ত্বিক এ ফসলটি কৃষি গবেষণা, মসলা গবেষণাসহ কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগন্য। মরিচে তেমন বেশী কীট-পতঙ্গ আক্রমন করে না কিন্তু রোগ বালাই দ্বারা ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাই মরিচ চাষি ভাই ও কৃষিশিক্ষার সুবিধার্থে এ ফসলের রোগ বালাই ও প্রতিকার আলোচনা করা হলো।

এনথ্রাকনোজ (অহঃযৎধপহড়ংব) রোগঃ

এ রোগটি মরিচের জন্য খুবই মারাক্ত এবং প্রধান শক্র হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এ রোগের জন্য ফলন শুন্যের কোটায় আসতে পারে। কোলিট্রোটিকাম কেপছিসি (ঈড়ষষবঃড়ঃৎরপযঁস পধঢ়ংরপর) নামক এক প্রকার ছএাক দ্বারা এ রোগটি হয়ে থাকে। আপেক্ষিক আদ্রতা যখন ৯৫ শতাংশের উপরে থাকে এবং পরিবেশের তাপমাএা  ২৬-৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস হয় তখন এ রোগের পরিমান বাড়ে। বাংলাদেশে বর্ষা কালে অনুকুল অবস্থাবেশী থাকে; তাই ঐ সময়ে রোগটি বেশী দেখা যায়।

লক্ষণ : ক) মরিচ গাছেঃ (১) মরিচ গাছের ফুল ও কচি ডগাতে প্রথম আক্রমণ করে নির্তেজ করে। (২) আক্রান্ত ফুল প্রথমে নোয়াইয়ে পড়ে এবং পরে শুকে ঝরে পড়ে। (৩) আক্রান্ত গাছের বাকল প্রথমে বাদামি বর্ণ এবং পরে সাদা হয়ে ডোরাকাটা দাগ সৃষ্টি হয়। (৪) গাছের ডাল আগা হতে শুকে মরে যায়।

(খ) ফলঃ (১) কচি ও বয়স্ক উভয় প্রকার মরিচ আক্রান্ত হয়ে ফলের উপরাংশে কালো কালো দাগ সৃষ্টি হয়। (২) রোগের মাইসেলিয়াম ফলের মধ্যে ফাঁকা স্থানে ছড়ে পড়ে এবং বীজকে আক্রমণ করে। (৩) আক্রান্ত মরিচ বিকৃত হয়ে শুকে যায়।

প্রতিকারঃ (১) সুস্থ্য ফল হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। (২) আশপাশে রোগ আক্রান্ত গাছ ও ধুতরা জাতীয় গাছ রাখা যাবে না এবং আগাছা পরিস্কার রাখতে হবে। (৩) জমি সুনিস্কাসিত রাখতে হবে। (৪) বীজ বপনের পূর্বে মারকিউরিক কোরাইড বা হালকা গরম পানি দ্বারা শোধন করে নিতে হবে। (৫) ডাইথেন এম-৪৫ কীটনাশক ০.২ শতাংশ হারে পানিতে মিশে ১০-১৫ দিন পর পর ২-৩ বার ¯েপ্র করতে হবে। অথবা একরোবাট এম জেট ৩০ গ্রাম বা বাভিসটিন ৫০ ডব্লিউ ১৫ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশে প্রতি ৫ (পাঁচ) শতাংশ জমিতে ১০-১৫ দিন পর পর ২-৩ বার প্রয়োগ করতে হবে।

ঢলে পড়া (উধসঢ়রহম)/ উইল্ট (ডরষঃ)

ফিউজেরিয়াম এননাম (ঋঁংধৎরঁস ধহহঁঁস) নামক এক প্রকার ছএাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

লক্ষণঃ (১) প্রথমে গাছের নীচের পাতা ঝুলে পড়ে। (২) কাণ্ডের গোড়ার কোষসমুহ ক্ষতি সাধন হয় ও কালো দেখায়। (৩) গাছ দ্রুত ঢলে পড়ে। (৪) কচি ডগাসমুহ মরে বাদামি রঙ ধারন করে। (৫) কাণ্ডের গোড়ায় মাটির নীচের অংশে ক্যাংকার সৃষ্টি হয়। (৬) রোগ আক্রান্ত গাছের শিকড়সমুহ নরম ও ভেজা মনে হয়।

প্রতিকারঃ (১) জমিতে পানি নিস্কাশনের ভাল ব্যবস্থা থাকতে হবে। (২) পরিমিত সেচ দিতে হবে। (৩) জমির মাটি ৪৫-৬০ সে. মি. উচু করে সারিবদ্দ ভাবে গাছ লাগাতে হবে। (৪) রোগ প্রতিরোধি জাত ব্যবহার করতে হবে। (৫) রোগান্ত গাছ তুলে ফেলতে হবে। (৬) বাভিসটিন ৫০ ডব্লিউ ১৫ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশে প্রতি ৫ শতাংশ জমিতে ১০-১৫ দিন পর পর ২-৩ বার ¯েপ্র করতে হবে।

ভাইরাস (ঠরৎঁং) রোগঃ মরিচ গাছে অনেক প্রকার ভাইরাস আক্রমণ করে। তবে সব চেয়ে

বেশী আক্রমণ করে কুমড়া ও তামাকের মোজাইক ভাইরাস এবং আলুর ওয়াই ভাইরাস।

লক্ষণঃ (১) রোগ আক্রান্ত গাছ কোঁকড়ায়ে যায় ও বামনাকৃতি হয়। (২) গাছের পাতার শিরা ও উপশিরাগুলি সবুজ কণাবিহীন হয়ে যায়। (৩) ফলের আকার ছোট ও বিকৃতি হয়।

প্রতিকারঃ (১) রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে। (২) ফসলের ক্ষেতে আগাছা রাখা যাবে না। (৩) ক্ষেতের পাশে টমেটোর ক্ষেত রাখা যাবে না। (৪) সবুজ এপিড দ্বরা এ রোগ বিস্তার হয়; তাই কীটনাশক প্রয়োগ করে ধংস করতে হবে (উদাহারনঃ মেলাথিয়ন ৫৭ ইসি ০.১ শতাংশ হারে পানিতে মিশে ¯েপ্র করলে এপিড মারা যায়)।

সঠিক ভাবে রোগ বালাই দমন করে অধিক পরিমান মরিচ উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মেটানো যেতে পারে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদেশে রপ্তানি  করে দেশকে সমৃদ্ধশালি করা যেতে পারে।

————————————–

লেখক :

প্রভাষক কৃষিশিক্ষা বিভাগ, সিটি কলেজ, নাটোর।

মোবাইল : ০১৭২২-৪০৩২২০

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *