মসলা উৎপাদনে সমস্যা ও সম্ভাবনা

কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ

মসলার দাম অন্যান্য খাদ্যপণ্যের চেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়ছে।  বিশেষ করে ঈদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও শীতকালে মসলার চাহিদা ও দাম বেশি বাড়ে। বাংলাদেশে মসলা জাতীয় ফসলের বার্ষিক চাহিদা ২৪-২৫ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ হেক্টর জমিতে মসলা জাতীয় ফসলের চাষাবাদ হয় এবং প্রায় ১৬-১৭ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়। অর্থাৎ ৭-৮ লাখ মেট্রিক টন মসলা আমদানি করতে হয়। অথচ বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু, আবহাওয়া সবকিছু মসলা চাষের উপযোগী। দেশের মসলা গবেষণা কেন্দ্রও আছে। অনেক জাতও উদ্ভাবন করা হয়েছে। তা হলে উৎপাদনে সমস্যা কোথায়? গত কয়েক বছরে কিছু মসলার দাম দ্বিগুণ থেকে ছয়গুণ বেড়েছে। কোনটির দাম আবার কমবেশি হয়।

মসলার জাত

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১০৯ প্রকার মসলা জাতীয় ফসলের চাষাবাদ হয়। দেশে ব্যবহার হয় ২৭ প্রকার মসলা এবং ১৭ প্রকার মসলা জাতীয় ফসল চাষাবাদ হয়। দেশে আবাদকৃত মসলাগুলো হলো  : মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া, মৌরি, কালোজিরা, ফিরিঙ্গি, তেজপাতা, মেথি, গোলমরিচ ইত্যাদি। দেশে মসলার বিশাল ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউটের অধীনে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় ১৯৯৪ সালে মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর ১০টি আঞ্চলিক অফিস রয়েছে। ২৬ জন বিজ্ঞানী ৪০ জন কর্মকর্তা মসলা গবেষণা নিয়ে কাজ করছেন। এ পর্যন্ত  ১৬টি জাত এবং ৮১টি উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবন করেছে। ফলনসহ উদ্ভাবিত জাতগুলো হলো মসলা গবেষণা কেন্দ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মল্লিক বলেন, এসব জাত জনপ্রিয় করার জন্য কৃষকের জমিতে প্রদর্শনী প্লট করা হয়। কৃষক ও সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তিনি বলেন, দেশে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় এলাচি, লবঙ্গ ও দারুচিনি চাষ করা যায় না। তবে কালো এলাচি চাষ করা যায়। গোল মরিচ, লবঙ্গ ও দারুচিনির জন্য বেশি বৃষ্টিপাত দরকার। দেশের পাহাড়ি এলাকায় গোলমরিচ করা যেতে পারে। বৃষ্টিপাত কম ও কুয়াশা বেশি হয় বলে জিরা চাষ করা যায় না। জার্মপ্লাজমের অভাবের জন্য এলাচি চাষ করা যাচ্ছে না। দেশে মসলা জমির অভাব এবং বীজের অভাব হওয়ায় কৃষকরা চাষ করে না। তবে মসলা ফসলে লাভ বেশি হলে অবশ্যই চাষ বেশি করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এসব চাষে জলবায়ু পরিবর্তন বড় সমস্যা।

চাহিদা ও ঘাটতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, মসলার চাহিদা পূরণের জন্য দৈনিক একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রধান পাঁচটি মসলা (মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও হলুদ) ৩৮ গ্রাম খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দেশের মোট উৎপাদন ও আমদানি মিলে দৈনিক মাথাপিছু মাত্র ৮ গ্রাম মসলার চাহিদা পূরণ হয়। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ ঘাটতি রয়েছে। দেশে বর্তমানে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৬ লাখ টন। গত বছর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টন অর্থাৎ ঘাটতি ২ লাখ টন। রসুনের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন, উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ টন অর্থাৎ ঘাটতি ১ লাখ টন। আদার বার্ষিক চাহিদা ২.৫ লক্ষ টন, উৎপাদন হয়েছে ১.৫ লাক্ষ টন, অর্থাৎ ঘাটতি ১ লাখ টন। হলুদের চাহিদা ২ লাখ টন, উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ টন, অর্থাৎ ঘাটতি ১ লাখ টন। মরিচের চাহিদা ৩ লাখ টন, উৎপাদন হয় ২.৫ লাখ টন। এলাচি, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ও জিরা দেশে উৎপাদন হয় না। এসব মসলার ঘাটতি ও চাহিদা পূরনের জন্য ১২০০ থেকে ১৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। গত ৪ বছরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে বিভিন্ন মসলার জমির পরিমান ও উৎপাদন এখানে উল্লেখ করা হলো।

 

স্বারণি- ১  : বাংলাদেশে মসলা উৎপাদনে ব্যাবহৃত জমি (লক্ষ হেক্টর) ও উৎপাদন (লক্ষ মেট্টিক টন)

 

 

উক্ত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, মসলার উৎপাদন কোন বছর বাড়ছে, আবার কোন বছর কমছে। জমি কমছে ও মসলার চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু উৎপাদন কম, লাভ বেশি। যেমনÑ আদা চাষে একর প্রতি খরচ হয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা। ফলন হয় প্রায় ৬ টন। মোট আয় হয় ৫০ টাকা কেজি হিসেবেÑ প্রায় ৩০ হাজার টাকা। হলুদ চাষে একর প্রতি খরচ হয়  প্রায় ১৩ হাজার টাকা। ফলন হয় প্রায় ১২ টন। শুকিয়ে ৩টন হয়। প্রতি কেজি ২০০ টাকা হিসেবে ৬ লাখ টাকা আয় হয়। উল্লেখ্য, গাছের ছায়ায়ও আদা ও হলুদ চাষ করা যায়। সার সেচসহ উৎপাদন খরচ কম। তবে চলতি বছর (২০১২) আদা ও হলুদ উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। ফলে আদা হলুদ চাষ করে এবার কৃষকরা লাভবান হয়নি। পেয়াঁজ, রসুন, ধনিয়া, মরিচ ইত্যাদি ফসলেও উৎপাদন খরচ কম লাভ বেশি।

ভেষজ গুণ

মসলা শুধু মসলা হিসেবেই ব্যবহৃত হয় না। মসলার রয়েছে অনেক ভেষজগুণ। পেয়াঁজÑ সর্দি, কাশি, পোকামাকড়ের দংশন, গ্যাষ্ট্রিক, উচ্চরক্তচাপ, হাঁপানি, বদহজম, পিত্তরোগ, অর্শরোগ, কিডনি রোগ, চুলপড়া, খুসকি, ইত্যদি প্রতিরোধ করে ও সারায়। পেয়াঁজÑ যৌবনশক্তি দৃষ্টিশক্তি ও বীর্য বাড়ায় এবং বিষনাশক, কফনাশক, উকুঁননাশক ও মেয়েদের ঋতুস্রাব স্বাভাবিক রাখে। রসুনÑ উচ্চরক্তচাপ কমায়, ফুসফুস, কিডনি, যকৃত ভালো রাখে, যৌনশক্তি বাড়ায়, বিষনাশক ও জীবাণুনাশক এবং সর্দি, ঠান্ডা ও কাশি ভালো করে। আদাÑ সর্দি, শ্বাসকষ্ট, কোষ্ঠ কাঠিন্য, বমি, হৃদরোগ, বাত উপশম করে। আদাÑ রুচি, বীর্য ও শক্তি বর্ধক। লবঙ্গÑ ঠাণ্ডা, সর্দি, কাশি, দাঁত, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্টে উপকারী। গোলমরিচÑ হজম, জ্বর, পেটে গ্যাস, দাঁতের রোগ, কফনাশক, কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে। দারুচিনিÑ কফ, বায়ু, চুলকানি, আমাশায়, অরুচি, হৃদরোগ, মুত্রাশয়ের অসুখ, অর্শ, কৃমি ও সর্দির উপশম করে। এলাচিÑ পিত্ত, কফ, চুলকানি, হাঁপানি, বমি, কাশি, পেট ফাঁপা, বমিতে উপকারী। হলুদ জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে।

সমস্যা

গত ৩৮ বছরে বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হলেও মসলা উৎপাদন তেমন উন্নতি হয়নি। এর কারণ হচ্ছে  : ১) সরকার, কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী, সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সকলের অবহেলা। ২) মানসম্পন্ন ও উচ্চ ফলনশীল বীজের অভাব। ৩) দানাজাতীয় শস্যের প্রতি আগ্রহ বেশি হওয়ায়। ৪) উৎপাদন স্বল্প মেয়াদী হওয়ায়। ৫) মসলা সংরক্ষণে ক্রটি হলে দ্রুত পচে যায়। ৬) জলবায়ু দ্রুত পরিবর্তন হওয়া। ৭) বীজ সহজলভ্য নয়। বিএডিসি, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, মসলা গবেষণা কেন্দ্র ও বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা মিলে মসলা বীজ চাহিদা মাত্র ১% সরবরাহ করতে পারছে। ৮) প্রচার ও সম্প্রসারণের অভাব। ৯) কৃষকদের মসলা চাষের জ্ঞান কম।

সমাধান

মসলা উৎপাদন বাড়াতে হলে  ১) ‘মসলা চাষ অধিক লাভজনক’Ñ এটা প্রচার, সম্প্রসারণ  ও  প্রদর্শনী প্লট করে প্রমাণ করতে হবে। এজন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা। ২) আবহাওয়া উপযোগী জাত উদ্ভাবন করা। ৩) ভালো বীজ সরবরাহ ও সহজলভ্য করা। ৪) লাগসই উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন করা। ৫) এলাচি, দারুচিনি ও লবঙ্গের জার্মপ্লাজম আমদানির ব্যবস্থা করা। ৬) অতিরিক্ত জমি ছাড়াও সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা যায়, এটা কৃষকদের জানানো। ৭) মসলা ফসল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। ৮) গবেষণা ও সম্প্রসারণের মধ্যে সমন্বয় রাখা। ৯) গ্রীষ্মকালীন পেয়াঁজ চাষ বাড়াতে হবে। ১০) নিবিড় ব্যবস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি করা। ১১) মসলা চাষে সরকারকে আগ্রহী হতে হবে। ১২) অন্যান্য ফসলের মত র্ভতুকি ও সহজশর্তে কৃষি ঋণ-দিতে হবে। ১৩) দেশের পতিত জমিÑ অনাবাদি জমি, রাস্তার পাড়, পুকুর পাড়, জমির আইল বাড়ির আঙ্গিনায় মসলা চাষের আওতায় আনা।

তবে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য দানাদার শস্যের মত মসলা ফসলে কৃষিন্ত্রণালয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য কৃষিমন্ত্রণালয়ে প্রকল্প গ্রহণ করে সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়ে দেশে মসলা উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে।

 

লেখক  : কৃষি সাংবাদিক ও কলেজ শিক্ষক।

মোবাইল  : ০১৭১১-৯৫৪১৪৩

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare