মহান মে দিবস নিশ্চিত হোক কৃষকের অধিকার

মোঃ বশিরুল ইসলাম

১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এ দিবস উপলক্ষে সারাদেশে আলোচনা, র‌্যালি, রেডিও, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকায় কতই না প্রচারিত হবে এ দিবসটির গুরুত্ব নিয়ে। মন্ত্রী-এমপি থেকে সরকারে উচ্চপদস্থ বড় আমলা থেকে বড় বড় লোকজন অনুষ্ঠানে বক্ততা করবে। অথচ সমাজের উঁচুতলার ওসব আলোচনা কিংবা বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ব্যাপারে আমাদের কৃষকরা অবগত নয়। এ দিন সরকারিভাবে সকল অফিস আদালত বন্ধ থাকলেও আমাদের কৃষক সমাজ দিন-রাত পরিশ্রম করে ফসল ফলানো কাজে ব্যস্থ থাকছে। কিন্তু তাদের খোঁজ কি কেউ রাখে? পয়লা মে একটি আন্তর্জাতিক দিবস। আমাদের দেশ বিশ্ব সভার একটি সদস্য দেশ বলে এ দিনে একযোগে সাধারণ ছুটিও পালিত হয়ে থাকে এর সম্মানার্থে।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নির্দিষ্ট সময়মাফিক কাজ করার অধিকারকে স্বীকৃতি দানের জন্যই এ দিবস পালিত হয়। এ দিনে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ স্মরণ করে তাদের পূর্বসূরীদের। ১৮৮৬ সালের পয়লা মে। আমেরিকার হে মার্কেটে ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রামরত অবস্থায় শ্রমিকরা সেদিন গুলী খেয়েছিল। সেদিন রাজপথ লাল হয়েছিল তাদের রক্তে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত এ দিবস পালিত হচ্ছে সারা বিশ্বে। দিনে দিনে কিছু কিছু করে উন্নতি হলেও এখনও আমাদের কৃষকরা তাদের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। ফসল ফলাতে গিয়ে একজন কৃষকের কী রকম শ্রম ও অর্থের প্রয়োজন হয় তা আমাদের জানা। এ দেশের কৃষকরা হরতাল করতে পারে না, তারা দুর্বল কণ্ঠ নিয়ে তাদের ন্যায্যমূল্য ও ন্যায্য অধিকারের আন্দোলনও জানে না। কৃষির ওপর নির্ভরশীল এ দেশে কৃষকদের দুর্দশা আর কতদিন চলবে- এ প্রশ্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছেই রইল।

এটা বলাই বাহুল্য যে, অনেক সময়ে দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে নানা বিষয়েই এমন বাস্তবতা তৈরি হয়, যার ফলে কৃষকের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যা বিভিন্ন সময়ের পত্রপত্রিকাতেও এসেছে। এমনকি বাম্পার ফলনের পরেও কৃষকের লাভ করা তো দূরের কথা উৎপাদন খরচই উঠে আসে না। অথচ কৃষকেরা ঋণ গ্রহণসহ নানা প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে উৎপাদন করে, তার পরেও যদি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি মনে করি এই ধরণের যে কোনো বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে সরকারকে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা সমীচীন, যেন কৃষকেরা বিপর্যস্ত পরিস্থিতিকে মোকবেলা করে আবারো ফসল উৎপাদনে নেমে পড়তে পারে।

কৃষকরা ঘামঝরা পরিশ্রম করে এদেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য জোগান দিয়ে চলছে। কিন্তু তাদের পরিশ্রম থেকে যতটুকু উৎপাদন ও আয় হওয়া উচিত, তা তারা পাচ্ছে না। কৃষকের ফসলের লাভের অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দখলে। এর ওপর আছে বাজারদরের ব্যাপক ওঠানামা, পরিবহন জটিলতাসহ পণ্য স্থানান্তরে কালক্ষেপণের দীর্ঘসূত্রিতা, আছে উৎপাদন পর্যায়ে নানা রকমের ঝুঁকি। এবার ফাল্গুনের শেষে দিকে এবং চৈত্র মাসে যে বৃষ্টি হলো তাতে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক তরমুজ ও আলু চাষি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। বাজারে এখন তরমুজ পর্যাপ্ত থাকার কথা থাকলেও পরিমানে খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। বৃষ্টিতে অনেক ফসলি জমি ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। আমে ফলনে কিছু প্রভাব পড়তেও পারে।

একটি বিষয় স্পষ্ট করে বুঝতে হবে, শুধু কৃষিতে ভর্তুকি, সার, বীজ সরবরাহ করলেই হবে না, একই সঙ্গে কৃষিপণ্য উপযুক্ত মূল্য যেন কৃষক পায় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কৃষক কৃষিকাজ করে যে খাদ্যশস্য উৎপাদন করে তা থেকে যদি সে লাভবান হয় তাহলেই কৃষি উৎপাদন বাড়বে। তাই দেশে যথাযথ খাদ্যের সংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে হবে। আর তাদের বাঁচাতে হলে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে এবং এ ভর্তুকি যাতে প্রকৃত কৃষক পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কৃষক তার মেধা ও শ্রম দিয়ে উৎপাদন করে দেশের সামগ্রিক গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কৃষকের অধিকার খর্ব হলে তার চেয়ে পরিতাপের আর কিছু হতে পারে না। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কৃষকদের সমস্যাগুলো সমাধান না করলে দেশের সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

আমরা সবাই জানি, আমাদের জীবন বাঁচানোর সরাসরি নিয়ামক হচ্ছে কৃষি থেকে প্রাপ্ত অনুষঙ্গই। এ কৃষি থেকেই আসে খাদ্য ও পুষ্টি। যা আমাদের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর একমাত্র উপাদান। যেহেতু আমাদের চাহিদা তথা প্রয়োজনের বড় প্রাপ্তি কৃষি থেকে আসে, তাই বিরাট ভরসার স্থল এবং বেঁচে থাকার ও উন্নয়নের নির্ঘণ্টক মৌলিক ক্ষেত্রও কৃষি। কৃষি উৎপাদন ভালো হলে জাতীয় অর্থনীতি হয়ে ওঠে সবল ও সমৃদ্ধ। আর কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশে আসে অভাব ও দুর্যোগ। হাহাকার দেখা যায় চারদিকে। কৃষিকাজ করে কৃষক যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে কৃষি উৎপাদন তথা খাদ্যশস্য উৎপাদন কমবে। খাদ্যশস্য উৎপাদন কমলে দেশ খাদ্যের উপর আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। একপর্যায়ে দেশে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিবে।

আমাদের দেশে কৃষি ও কৃষককে কেন্দ্র করে প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের কৃষক সংগঠন রয়েছে। এ সংগঠন কৃষককে কেন্দ্র করে গঠন করা হলেও রাজনীতির মূলধারা থেকে প্রান্তে ঠেলে দেয়া হয় কৃষি ও কৃষকের স্বার্থকে। বরং দলীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকে এ সংগঠনগুলো। আশির দশকে ক্ষেতমজুর আন্দোলনের পর কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। এভাবে অধিকারহীন কৃষকরা আজ অসংগঠিত, অসহায় ও ভাষাহীন। শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে আমরা দেখেছি, গ্রামের জমিদার ও পুরোহিতদের অত্যাচারে গরিব চাষি গফুরের মেয়ে আমিনার হাত ধরে রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে যাত্রা করতে বাধ্য হয়েছিল। ভূমি থেকে উৎখাত হওয়ার পর কৃষকের এই যে করুণ অবস্থা, তা থেকে এ দেশ আজও মুক্ত হয়নি।

আমরা যদি বর্তমানে কৃষকদের বাজার ব্যবস্থা দিকে নজর দেই তাহলে দেখব দেশে এক এক বাজারে পন্য মূল্য এক এক ধরণের। কোথাও আলুর কেজি ২ টাকা, আবার সে আলু রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা। কোথাও মরিচের কেজি ৫ টাকা, আবার একই সময় এ মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা। এ থেকে প্রমানিত হয় যে, কৃষকদের জন্য সুসংগঠিত কোনো বাজার ব্যবস্থাপনা আজও গড়ে ওঠেনি। কৃষক স্বতন্ত্রভাবে তাদের পণ্য বিপণন করছে পারছে না। এতে প্রত্যেককেই আলাদাভাবে বাজার খুঁজতে হচ্ছে, বাজারে সেসব পণ্য নিজেদেরই পরিবহন করে নিয়ে যেতে হচ্ছে, নিজেদেরই বিক্রির জন্য চেষ্টা করতে হচ্ছে ও বিক্রির পর টাকা পাওয়ার জন্য ধরনা দিতে হচ্ছে। এতে প্রত্যেকেরই সময়, শ্রম ও পরিবহন খরচ বেশি লাগছে।

উৎপাদন পর্যায়ে স্বতন্ত্র কৃষকের উৎপাদনকে উৎসাহিত না করে দলগতভাবে কৃষি পণ্য উৎপাদনে সম্পৃক্ত করতে পারলে কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়বে, মান বাড়বে, খামারে যান্ত্রিকীকরণের ফলে শ্রমিক ব্যয় ও অন্যান্য খরচসহ উৎপাদন ব্যয় কমবে ও নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের মাধ্যমে বাজার সংযোগ সহজ হবে। সামগ্রিকভাবে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সব কর্মকান্ড পরিকল্পনামাফিক করা সম্ভব হবে। কৃষকরাও কৃষি পণ্য উৎপাদনে লাভ-ক্ষতির বিষয় হিসাব করতে পারবে ও বুঝতে পারবে যে কোনো পণ্য উৎপাদন করে কত বেশি মুনাফা হচ্ছে।

বিশ্বের অনেক দেশে কৃষিকাজ লাভজনক হলেও বাংলাদেশে একেবারেই নয়। এজন্য আজ কেউ তার সন্তানকে কৃষক বানাতে চায় না। উন্নত দেশে অকৃষি খাতগুলো অনেক লাভজনক হওয়ায় কৃষিতে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ জড়িত থাকে, ফলে তারা লাভ করতে পারে, এদেশে সেটা হয়নি। বাংলাদেশে ভোক্তারা চায় কম দামে কৃষি পণ্য ক্রয় করতে আর কৃষকরা চায় লাভজনক দাম। এ দুইয়ের দ্বন্দ্ব নিরসন করতে হয় সরকারকে। সারের দাম কমিয়ে, ১০ টাকায় একাউন্ট খোলা ও বিভিন্নভাবে সরকার কৃষককে সাহায্য করে এটা সমাধান করার চেষ্টা করছে। এখন শিক্ষিত লোকেরা কৃষিতে আসছে না, এটা খুবই খারাপ লক্ষণ। দেশী-বিদেশী কৃষি জ্ঞান ও প্রযুক্তির আরও প্রচার-প্রসার এবং শিক্ষিত লোককে কৃষি খাতে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এ খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য যাতে কৃষক গ্রুপের বা সংগঠনের মাধ্যমে  বিপণন বা রপ্তানি করা যায় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা, বাংলাদেশ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, আম, সবজি এসব রপ্তানিতে সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের মান এবং সুনাম ধরে রাখতে পারে বাংলাদেশেরই বিশ্বস্ত কৃষক ও কৃষক সংগঠন। সময় এসেছে কৃষকবান্ধব ব্যবসা চালু করার।

আমি মনে করি, যদি বাংলাদেশের কৃষকের স্বার্থ রক্ষা না হয় তবে তার সার্বিক ফলাফল কোনোভাবেই ইতিবাচক হওয়া সম্ভব নয়। তাই কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবী।

————————————–

লেখকঃ

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

মোবাইল-০১৭১৬-৫৮১০৮৬।

ই-মেইল-mbashir1986@yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare