‘মিনিকেট চাল’ প্রতারণার অভিনব ফাঁদ

বাজারে চাল কিনতে গেলে দেখা মেলে ‘মিনিকেট চাল’। মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রথম পছন্দের মধ্যে অন্যতম চাল। চিকন ঝকঝকে এই চালের দামও অন্যান্য সাধারণ চালের চেয়ে অনেক বেশি। অথচ এই নামে কোনো চালের জাত নেই, চাষও হয়না বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ব্রি) থেকেও এমন কোন জাত অবমুক্ত করা হয়নি বলে দাবী করা হয়েছে বাংলাদেশ কিংবা ভারত-কোনো দেশেই মিনিকেট নামে ধানের কোনো জাতের অস্তিত্ব মেলেনি এখন পর্যন্ত। তাহলে মিনিকেট চালের নামে উদ্ভট এই চাল এলো কোথা থেকে?

অনুসন্ধানে জান যায়, শস্য ভান্ডার খ্যাত দিনাজপুরে ‘মিনিকেট’ চালের নামে চলছে প্রতারণার অভিনব এক কৌশল। মূলত, এক শ্রেণির চালকল মালিক ভোক্তাদের বোকা বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মোটা চাল সরু করে তা ‘মিনিকেট’ নামে চালিয়ে যাচ্ছে। অটোরাইস মিলে রয়েছে একটি অতি বেগুনি রশ্মির ডিজিটাল সেন্সর প্ল্যান্ট। এর মধ্য দিয়ে যে কোনো ধান বা চাল পার হলে সেটি থেকে প্রথমে কালো, ময়লা ও পাথর সরিয়ে ফেলা হয়। তারপর মোটা চাল চলে যায় অটোরাইস মিলের বয়লার ইউনিটে। সেখানে পর্যায়ক্রমে ৫টি ধাপ পার হওয়ার পর লাল কিংবা মোটা চাল সাদা রং ধারণ করে। এরপর আসে পলিশিং মেশিংয়ে। অতি সূক্ষ্ম এই মেশিনে মোটা চালের চারপাশ কেটে সেটিকে চিকন আকার দেয়া হয়। এরপর সেটি আবার পলিশ ও স্টিম দিয়ে চকচকে শক্ত আকার দেওয়া হয়। সবশেষে সেটি হয়ে যায় আকর্ষণীয় ও কথিত মিনিকেট চাল।

জানা যায়, ‘১৯৯৫ সালের দিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি গ্রস্ত ভারতের কৃষকদের মাঝে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নতুন জাতের চিকন ‘শতাব্দী’ ধানবীজ বিতরণ করে। মাঠপর্যায়ে চাষের জন্য কৃষকদের এধান বীজের সঙ্গে আরো কিছু কৃষি উপকরণ সহ একটি মিনি প্যাকেট দেয়া হয়। ওই প্যাকেটকে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বলত ‘মিনিকিটস’ নামে। সেখান থেকেই ‘শতাব্দী’ ধানের নাম হয়ে যায় ‘মিনিকেট’। আবার অনেকে বলেন, ‘মিনিপ্যাকেটে করে দেয়ায় ভারতীয় কৃষকদের কাছে এধান শেষমেশ মিনিকিট বলে পরিচিতি লাভ করে। কৃষকরা মিনিপ্যাকেট শব্দটির মধ্য থেকে ‘প্যা’ অক্ষর টি বাদ দিয়ে সেটি মিনিকেট বলে পরিচয় দিতে শুরু করে। তবে নামকরণের পেছনে যে রহস্যই থাকুকনা কেন, মিনিকেট নামে কোনো চালের জাত নেই এটাই চরম বাস্তবতা। মোটা চালকে পলিশ করে মিনিকেট চাল বলে বিক্রি করা হচ্ছে আমাদের দেশের বাজারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাটিং, পলিশ ও কালার ঠিক রাখার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন কেমিক্যাল। এতে চালের পুষ্টিগুণ যেমন কমে যায়, তেমনি তা মানবদেহে ক্যান্সারসহ নানা রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। অথচ মানুষ না জেনে ঝকঝকে ‘মিনিকেট’ উৎকৃষ্ট চাল ভেবে বেশি দামে কিনে খাচ্ছে। বিআর ২৮, কল্যাণী, স্বর্ণা, গুটি স্বর্ণা, লাল স্বর্ণা, জাম্বুও কাজল লতা জাতের ধান ছেঁটে মিনিকেট বলে বস্তায় ভরে বিক্রি করা হচ্ছে বলে বিস্তর অভিযোগ আছে মুনাফা খোরদের বিরুদ্ধে। পরিশেষে, এহেন প্রতারণা কারীদের ফাঁদ থেকে বাচঁতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জনস্বার্থে এগিয়ে আসতে হবে। দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে ব্যবসার নামে জমজমাট প্রতারণার জন্য দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দিতে হবে এটাই আজ সময়ের দাবী।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare