মূলার বীজ উৎপাদন প্রযুক্তি

 

মোঃ রফি উদ্দিন

 

ভূমিকাঃ মূলা বাংলাদেশের একটি অতি প্রচলিত শীত কালীন সব্জি। সবুজ পাতায় প্রচুর পরিমাণে খাদ্যপ্রাণ ‘‘এ’’ পাওয়া যায় যা বিশেষ করে শিশুদের রাতকানা রোগ নিরাময়ে ভূমিকা রাখে। এছাড়া মূলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যপ্রাণ ‘‘সি’’ রয়েছে। খাদ্যপ্রাণ ছাড়াও মূলায় প্রচুর পরিমাণে আঁশ, আমিষ, শর্করা, চর্বি, ক্যালসিয়াম, লৌহ এবং ঔষধি গুণাগুন বিদ্যমান। ভক্ষণযোগ্য (অপরিপক্ক) প্রতি ১০০ গ্রাম মূলায় শ্বেতসার ২৫.০০ গ্রাম, আমিষ ২.৫০ গ্রাম, ভিটামিন ‘বি-১’ ৩.১০ গ্রাম, ভিটামিন ‘বি-২’ ০.৩০ গ্রাম, ভিটামিন ‘সি’ ০.৯০ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৯০ গ্রাম, আয়রণ ১.৪০ গ্রাম এবং ক্যারোটিন ৯০০০ আন্তঃএকক বিদ্যামান।

 

জলবায়ু ও মাটিঃ মূলা প্রধানত শীত মৌসুমের সবজি। মূলা চাষের জন্য ১০-১২০ সেঃ তাপমাত্রা ও কিঞ্চিৎ আর্দ্রতা সবচেয়ে উপযোগী। গ্রীষ্ম মৌসুমে চাষ করলে মূলা ঝাজালো ও ফলন কম হয়। পানি সেচের ব্যবস্থা আছে এমন বেলে দোআঁশ মাটি মূলা চাষের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট। তবে পলি দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ মাটিসহ প্রায় সব মাটিতেই পরিমিত সার ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করলে লাভজনক ভাবে মূলা চাষ করা যেতে পারে। মূলার জমির মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ রস থাকা বাঞ্চনীয়।

 

জাতঃ কিছুদিন পূর্বেও বাংলাদেশে জাপানি মূলা মিনোআর্লী, মিয়াশীগি ইত্যাদি জাতের মূলার চাষ করা হতো যেগুলো শংকর জাতের এবং এদেশের আবহাওয়ায় বীজ হয় না। এখন বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট মূলার চারটি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। জাতগুলো স্থানীয় আবহাওয়ায় বীজ উৎপাদন করতে সক্ষম।

 

বারি মূলা -১ (তাসাকীসান মূলা): এ জাতের মূলা ধবধবে সাদা এবং বেলুনাকৃতি। মূলা গড়ে ৪০ সে. মি. লম্বা এবং ৭ সে. মি. বেড় হয়। বীজ বপনের ৪৫ দিনের মধ্যেই মূলা বিক্রির উপযুক্ত হয়। হেক্টর প্রতি মূলার ফলন গড়ে ৭৫ টন (৩০০ কেজি/শতাংশ)। স্থানীয় আবহাওয়ায় বীজ উৎপাদন করতে সক্ষম। বীজের ফলন হেক্টর প্রতি ১.৫-২ টন (৬-৮ কেজি/শতাংশ)।

 

বারি মূলা -২ (পিংকি): নলাকৃতি এ মূলা আকর্ষণীয় গোলাপী রংয়ের। গড়ে ৩০ সে.মি. লম্বা এবং ৭ সে.মি. ব্যাসযুক্ত। বীজ বপনের ৫০ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়। এ জাতের মূলার ফলন হেক্টর প্রতি ৬০ টন (২৪০ কেজি/শতাংশ)। এ দেশের আবহাওয়ায় বিশেষ করে উত্তারাঞ্চলে (রংপুর, দিনাজপুর) গড়ে প্রায় ১.০ টন (৪ কেজি/শতাংশ) বীজ উৎপাদন করতে সক্ষম। এটি কিছুটা নাবি জাতের মূলা

 

বারি মূলা -৩ (দ্রুতি): এ জাতের মূলার রং ধবধবে সাদা ও আকৃতি অনেকটা নলাকার। এ জাতের মূলা বর্ধণশীল এবং ৪০-৪৫ দিনের মধ্যেই খাবার উপযোগী হয়। মূলার গড় ওজন ৫০০ গ্রাম ও লম্বা  ২৫ সে.মি.। মূলার গড় ফলন ৫৫ টন (২০০ কেজি/শতাংশ) প্রতি হেক্টরে। এ দেশের আবহাওয়ায় বীজ উৎপাদন করতে সক্ষম। বীজের  ফলন হেক্টর প্রতি ১.২ টন (৫ কেজি/শতাংশ)।

 

বারি মূলা -৪ (দ্রুতি): মূলা লম্বাকৃতি ও ধবধবে সাদা বর্ণের। পাতা খাজকাটাবিশিষ্ট (জাপানী সিনে আর্লী টাইপ)। প্রতিটি মূলার গড় ওজন ৭০০-৮০০ গ্রাম এবং লম্বায় ৩০-৩৫ সে.মি.। হেক্টর প্রতি মূলার ফলন ৬৫-৭০ টন। জাতটি দেশীয় আবহাওয়ায় হেক্টর প্রতি ১.২-১.৫ টন বীজ উৎপন্ন হয়।

 

জীবনকালঃ জাতভেদে জীবন কালের কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।

 

আগাম জাতঃ বীজ বপন থেকে মূলা উৎপাদন ৪৫-৬০ দিন।

 

নাবি জাতঃ বীজ বপন থেকে মূলা উৎপাদন ৭০-৭৫ দিন।

 

বীজ উৎপাদনের জন্যঃ বীজ বপন থেকে বীজ উত্তোলন পর্যন্ত ১৫০-১৮০ দিন।

 

বীজ বপনের সময়ঃ

*           আগাম ফসলের জন্যঃ সেপ্টেম্বর মাস

*           মাঝারী ফসলের জন্যঃ অক্টোবর মাস

*           নাবি ফসলের জন্যঃ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস

*            বীজ উৎপাদনের জন্য অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বীজ বপন করতে হবে।

 

বীজের মাত্রাঃ বীজের মাত্রা নির্ভর করে মূলার জাত, বপন পদ্ধতি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্বের উপর। প্রতি এক হাজার বীজের গড় ওজন ১০-১২ গ্রাম। এ হিসাবে প্রতি হেক্টর মূলা চাষের জন্য বীজ প্রয়োজন ২.৫ কেজি (১০ গ্রাম/শতাংশ)

 

জমি তৈরীঃ মূলা উৎপাদনের জন্য গভীর করে উপর্যুপরি চাষ দিয়ে জমি উত্তম রূপে তৈরী করা দরকার। মূলা বীজ সরাসরি জমিতে বপন করা হয়। তাই জমি তৈরীর উপর মূলার ফলন অনেকাংশে নির্ভর করে।

 

 

 

বীজ বপন পদ্ধতিঃ

*           মূলা বীজ সারিতে বপন করাই উত্তম। এজন্য জমি উত্তমরূপে তৈরী করার পর ৭৫ সে.মি. প্রশস্থ ‘বেড’ তৈরী করতে হবে। বেডের উভয় কিনারে ১৫ সে.মি. ছেড়ে দিয়ে বেডের লম্বালম্বি ৪৫ সে.মি. দূরত্বে দু’টি লাইন টানতে হবে। লাইন দু’টি ১-২ সে.মি. গভীর হতে হবে।

*           লাইনে ৩০ সে.মি. দূরে দূরে ২-৩টি বীজ ফেলে যেতে হবে। বীজ বপনের সাথে সাথে দু’পাশের ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে বীজ ভালভাবে ঢেকে দিতে হবে।

*           দুই বেডের মাঝে ৩০ সে.মি. চওড়া ও ১৫ সে.মি. গভীর নালা থাকতে হবে।

*          বীজ বপনের পরপরই একটি সেচ দেয়া উত্তম।

 

পরবর্তী পরিচর্যাঃ পাতলাকরণঃ বীজ বপনের ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই ৩০ সে.মি. দূরত্বে সবচেয়ে ভালো গাছটি রেখে বাকি সব গাছ পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে ফেলতে হবে।

 

সেচ প্রয়োগঃ মূলা চাষে প্রয়োজন মত সেচ দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জমিতে রসের অভাব হলে ১০-১২ দিন পর পর মোট ৩-৪টি সেচ দেয়া মূলার বৃদ্ধির জন্য উত্তম।

আগাছা দমন ও মাটির চটা ভেঙ্গে দেয়া

মূলার  জমি সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন মত নিড়ানী দিয়ে আগাছা পরিষ্কার ও মাটির চটা ভেঙ্গে দিতে হবে। এতে প্রচুর আলো বাতাস পেয়ে মূলা বৃদ্ধি পাবে।

 

ফসল সংগ্রহ ও ফলনঃ বীজ বপনের ৪৫ থেকে ৬৫ দিনের মধ্যে মূলা উত্তোলন করে বাজারজাত করা যায়। এ সময় মূলা গড়ে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজন করে। এসব মূলা ৬০-৬৫ দিন পর্যন্ত আঁশহীন থাকে।

ফলন: প্রতি হ্ক্টেরে ৬০-৭৫ টন (২৪০-৩০০ কেজি/শতাংশ)

 

বীজ উৎপাদনঃ

*           মূলা পরপরাগী উদ্ভিদ। সে জন্য বীজ ফসলের চারদিকে ১০০০ মিটারের মধ্যে অন্য কোন মূলার জাত চাষ করা যাবে না। জাতের বিশুদ্ধতা রার জন্য এ পৃথকীকরণ দূরত্ব অপরিহার্য।

*           বীজ ফসলের জন্য অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বীজ বপন করাই ভালো।

*           মূলার বয়স ৪০-৪৫ দিন হলে জমি থেকে সমস্ত মূলা উঠিয়ে জাতের বিশুদ্ধতা, আকৃতি, রোগবালাই ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে মূলা বাছাই করতে হবে।

*           বাছাইকৃত মূলার মূলের এক তৃতীয়াংশ এবং পাতার দুই তৃতীয়াংশ কেটে ফেলতে হবে। মূলের কাটা অংশ ডায়থেন এম-৪৫ (২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে) এর দ্রবণে ডুবিয়ে নিতে হবে।

*           পরে প্রস্তুত করা বেডে সারি পদ্ধতিতে ৪০ সে.মি. ৩০ সে.মি. দূরত্বে মূলা গর্তে স্থাপন করে পাতার নিচ পর্যন্ত মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

*           এ পদ্ধতিতে পুণরায় রোপণকৃত গাছ থেকে অধিক পরিমাণে উন্নত মানের বীজ পাওয়া যায়।

*           বীজ- ফসলের জমিতে ১০-১৫ দিন অন্তর সেচ দিতে হবে।

*           গাছে ফুল আসার পর হেক্টর প্রতি অতিরিক্ত ১০০ কেজি ইউরিয়া ও ১০০ কেজি এমপি সার বেডে ছিটিয়ে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

*           প্রতিকূল আবহাওয়ায় বীজ-ফসল যাতে মাটিতে পড়ে না সেজন্য ঠেকনা দিতে হবে।

*           মূলার বীজ ফসলে জাবপোকা দেখা দেওয়া মাত্র প্রিমোর/জোলন/ম্যালাথিয়ন কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২.০ মি.লি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর ¯েপ্র করতে হবে।

ক্স            অল্টারনারিয়া লিফ স্পট যদি মূলার পাতায় ও পডে (চড়ফ) দেখা দেয় তবে বীজ পরিপুষ্ট না হয়ে চিটা হয় এবং বীজের ফলন কমে যায়। এর প্রতিকার হিসাবে প্রতি লিটার পানিতে ২.০ গ্রাম রোভরাল মিশিয়ে গাছের ১০-১২ অন্তর ¯েপ্র করতে হবে।

*           বীজ বপনের পর ৫-৬ মাসের মধ্যেই বীজ সংগ্রহের উপযুক্ত হয়।

 

বীজের ফলনঃ হেক্টর প্রতি বীজের ফলন ১.৫-২.০ টন পর্যন্ত হতে পারে।

————————————–

লেখকঃ

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্যানতত্ত), আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *