+মৌমাছি আল্লাহর নির্দেশ পালনে সদা ব্যস্ত

 

ড. মো. আবু বকর*

 

কৃষিজাত ফসল উৎপাদনে মৌমাছির ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। গাছের বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ফুলের পরাগায়ন ফল ও বীজ উৎপত্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরাগায়ন অর্থাৎ পুরুষ ফুলের পরাগরেনু স্ত্রী ফুলের পূর্ণতা প্রাপ্ত পরাগধানীতে সংমিশ্রিত না হলে ফল কিংবা বীজের উদ্ভব ঘটবে না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের এই সৃষ্টির সকল প্রজাতিকেই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। এতদবিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন “ওয়াখালাক্বনাকুম আজ্বওয়াযা (সুরা নাবা: আয়াত : ৮)।

অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি। খোদার এ বিশাল সৃষ্টির প্রত্যেকটি ব্যক্তি বস্তু ও প্রাণী/জীব সৃষ্টি হয়েছে জোড়ায় জোড়ায়। সকল প্রাণীরই জোড়া রয়েছে স্ত্রী কিংবা পুরুষ। বস্তুতে রয়েছে ধনাত্মক এবং ঋনাত্মক, অনু বা পরমানুতে রয়েছে ইলেকট্টন এবং প্রোটন। কাজেই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্ট সকল জীবের রয়েছে স্ত্রী ও পুরুষ বৈশিষ্ট। যার মিলিত ফলই পুনরায় জীব সৃষ্টি করে। সৃষ্টি করে ফল ফলাদী ফসল ও নব নব উদ্ভিদরাজি কাজেই খোদার সৃষ্ট প্রকৃতিতে সৃষ্টি ও উদ্ভাবন এবং বৈচিত্র প্রদানের জন্য পরাগায়ন পদ্ধতি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ জৈব প্রজনন প্রক্রিয়া। এ পরাগায়ন সংগঠনে মৌমাছি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও পরাগায়ন প্রক্রিয়াটি বাতাসের মাধ্যমেও সংগঠনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মৌমাছি যেভাবে ফুল থেকে ফুলে সরাসরি ও প্রত্যক্ষ ভাবে পরাগায়নের পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ করে থাকে, বাতাস বৃষ্টির পানি বা অন্য কোন জীবের মাধ্যমে তা সংঘটিত হয় অনেকটা পরোক্ষভাবে।

এ মৌমাছি যে ভাবে তাদের কাজের মাধ্যমে মানুষের উপকারে সদা ব্যস্ত রয়েছে তা একান্তভাবে আল্লাহর তা’য়ালার নির্দেশেই করে যাচ্ছে। এ প্রসংগে কোরানুল কারীমে এরশাদ হচ্ছে এ ভাবে “ওয়া আওহা রাব্বুকা ইলান্নাহলি আনিত্তাখিজী মিনাল জীবালি বুয়ূতাও ওয়ামিনাশ শাজারী ওয়া মিম্মা ইয়া’রিশূন। ছুম্মা কূলী মিনকুল্লিস ছামারাতি ফাস্লুকী ছুবুলা রাব্বিকি জুলুলান ইয়াখরুজু মিম্ বুতুনিহা শারাবুম্ মুখ্তালিফুন আলওয়া নুহু ফীহী শিফাউল্লিন্নাস; ইন্না ফী জালিকা লা আয়াতাল্লি ক্বাত্তামিই ইয়্যাতাফাক্কারুন (সুরা আন নহল ঃ ৬৮-৬৯)।

অর্থাৎ আর লক্ষ্য করুন আপনার ‘রব’ মৌমাছির প্রতি ওহী করিলেন যে তোমরা পাহাড়ে-পর্বতে, গাছে এবং মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাতেও মৌচাক বানিয়ে নাও। তারপর সব রকমের (ফুল ও ফল থেকে) রস চুষে লও এবং তোমার ‘রবের’ নির্ধারিত পথে চলতে থাক। এ মৌমাছির ভিতর থেকে রং বেরংয়ের সরবত বের হয়। এতে নিরাময়তা রয়েছে লোকদের জন্য। নিশ্চয়ই এতেও নিদর্শন রয়েছে ঐ সব লোকদের জন্য যারা চিন্তা ও গবেষণা করে।

উপরোক্ত আয়াত থেকে জানা গেল আল্লাহ তায়ালা মৌমাছিকে ওহীর মাধ্যমে মৌচাক নির্মাণ ও মধু আহরণের নির্দেশ প্রদান করেছেন। এখানে “ওহী” কথাটির তাৎপর্য্য কি তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সাধারণভাবে আমরা জানি যে এ ওহী শুধু নবী রসুলগণের নিকটই ফেরেস্তার মাধ্যমে নাযিল হয়ে থাকে। তবে কোরানুল কারীমে “ওহী” শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমতঃ  “ওহীর” শাব্দিক অর্থ গোপন সুক্ষè ইঙ্গিত যার অর্থ ইঙ্গিত দাতা ও ইশারা প্রাপকই কেবল বুঝতে পারে। এরূপ ইশারা প্রদানের আরবী আরও দুইটি প্রতি শব্দ ব্যবহৃত হয়। তার একটি হল “ইল্কা” যার অর্থ কোন একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার সঠিক প্রতিবিধান জানিয়ে দেয়া। অপর শব্দটি হচ্ছে “ইল্হাম” যা কোন কোন বিষয়ের জ্ঞান গোপনে জানিয়ে বা শিখিয়ে দেয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে কোরান মজিদে এ শব্দ তিনটির পারিভাষিক ব্যবহারের এ পার্থক্য এ ভাবে পরিলক্ষিত হয় না। “ওহী” শব্দটি কোরানে কারীমের যে সকল ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে তার কিছু নমুনা এখানে উপস্থাপন করা হল ঃ

সুরা আল ঝিলঝাল এ উল্লিখিত হয়েছে “ইয়াওমা ইজিন তুহাদ্দিসু আখবারাহা, বি আন্না রাব্বাকা আওহালাহা (আয়াত ৪-৫)।

অর্থাৎ এই দিন যমীন উহার উপর সংঘটিত সকল কাহিনী বর্ণনা করবে। কারণ তোমরার রব তাকে উহার ই জন্য “ওহী” করে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে “ওহী” নির্দেশ (উরৎবপঃরড়হ) প্রদান অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

সুরা হা-মীম আস সাজদাহ এ এরশাদ হয়েছে এরূপ, “ওয়া আওহা ফীকুল্লিস সামায়ি আমরাহা (আয়াত-১২)।

অর্থাৎ এবং প্রত্যেক আসমানের প্রতি উহার দায়িত্বের কথা “ওহী” করিলেন। এখানেও “ওহী” শব্দটি নির্দেশনা প্রদান অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

সুরা আনফালে ফেরেশতাদের প্রতি ওহী করে বলা হয়েছে “ইজইউহী রাব্বুকা ইলাল মালায়ীকাতি আন্নী মা’কুম ফাছাব্বিতুল্লাজীনা আ’মানু (আয়াত-১২)।

অর্থাৎ স্মরণ কর যখন তোমার রব ফেরেস্তাদের “ওহী” করলেন যে নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সাথে আছি সুতরাং তোমরা মুমিনদেরকে সাহস দাও এবং তাদের পদক্ষেপকে অবিচল রাখো। এ ক্ষেত্রেও “ওহী” নির্দেশনা অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

সুরা আল কাসাস এ এরশাদ হয়েছে এভাবে “ওয়া আওহাইনা ইলা উম্মে মুসা আন আরদিয়ীহি। ফাইজা সিফতি আ’লাইহি ফা আলক্বীহি ফীল ইয়াম্মি ওয়ালা তাখাফী ওয়ালা তাহঝানী (আয়াত-৭)।

অর্থাৎ আমি মুসার (আঃ) মায়ের কাছে ওহী পাঠালাম যে তুমি মুসাকে বুকের দুধ খাওয়াও, যদি কখনও তার (নিরাপত্তার) ব্যাপারে তোমার ভয় হয় তা হলে (বাক্সে ভরে) তাকে সমুদ্রে ফেলে দিও কোনো রকম ভয় করোনা, দুচিন্তা করোনা। এ আয়াতে নবী মুসা (আঃ) এর মাকে যে ওহীর কথা বলা হয়েছে তাই হলো তাকে ইশারা বা ইঙ্গিত প্রদান। কারণ মুসা (আঃ) এর মায়ের কাছে কোন ফেরেশতা “ওহী” নিয়ে হাজির হয়েছে এমন কোন তথ্য নাই। তা হলে কিভাবে ওহী করা হলো। এর সম্ভাব্য এবং যুক্তিসংগত জওয়াব হলো এই যে আল্লাহ তায়ালা মুসা (আঃ) এর মায়ের অন্তরে এ বিষয় গুলোর শিক্ষা জাগিয়ে তুলে তার অন্তরে অভয় দান এবং শান্তনা প্রদান করলেন। এ ক্ষেত্রে ওহী ইশারা ইঙ্গিত কিংবা শিক্ষা প্রদান অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

কোরানুল কারীমের বিভিন্ন আয়াতে যে সকল ওহীর উল্লেখ করা হয়েছে তা সাধারণ ভাবে কোন বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনাকেই বুঝায়। কোন সৃষ্টিই এ ধরনের ওহী থেকে বঞ্চিত নয়। বিশেষতঃ মানুষ আজ পর্যন্ত যে সকল উদ্ভাবন এবং আবিস্কার করেছে, যে সকল নেতা ও সেনা নায়ক দেশ জয় করেছে, যে সকল চিন্তাবিদ ও গ্রন্থকারগণ সাড়া জাগানো গ্রন্থ বা বিশেষ কোন চিন্তা ধারা উদ্ভাবন করেছেন তাতে ওহীর কার্যকারিতা আশ্চর্য্যজনক ভাবে লক্ষ্য করা যায়। কখনও বসিয়া থাকা অবস্থায় একটি কথা মনে জেগে উঠলো, কোন উপায় উদ্ভাবিত হল কিংবা স্বপ্নে কোন কিছু দেখতে পেলো পরে বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হল যে এর দ্বারা সঠিক পথ নির্দেশই পাওয়া গিয়েছিল এবং গায়েব হতে তাকে ইহা জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। তবে এ প্রকার বহুবিধ ওহীর মধ্যে এক বিশেষ ওহী হচ্ছে তাই যা নবী রসুলগণের প্রতি নাযিল করে ধন্য করা হয়েছে। বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষত্বের দিক থেকে এ ওহী অন্য সাধারণ এবং উপরে আলোচিত ওহী থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ধরনের। এ ওহীর ক্ষেত্রে যাকে এ ওহী প্রদান করা হয় তার পূর্ণ চেতনা বিরাজমান থাকে যে ইহা আল্লাহর তরফ থেকে আসছে। এ ব্যাপারে ওহী প্রাপকের দৃঢ় বিশ্বাস থাকে। এ ধরনের ওহীর মাধ্যমে আকায়েদ, হুকুম আহকাম, আইন-বিধান ও পথ নির্দেশ জানা যায় এবং এ ওহীর মাধ্যমে নবী রসুলগণ মানব জাতিকে হেদায়াত প্রদান বা জীবন পরিচালনার নির্দেশনা প্রদান করে থাকেন।

সুরা আন নাহলের উদ্ধৃত দুটি আয়াতে যা মানুষের জন্য শিক্ষনীয় তা হচ্ছে এই যে মৌমাছি বা মধু মক্ষিকাকে আল্লাহ তায়ালা ওহীর মাধ্যমে উহার যাবতীয় কার্যাদী শিক্ষা দিয়েছেন। অনুরূপ শিক্ষা প্রদান শুধু মৌমাছিতেই সীমাবদ্ধ নয়। পক্ষীকুলকে শূন্যে উড়ে বেড়ানো, মাছ ও অন্যান্য পানিতে বিচরণশীল প্রাণীকে পানিতে সাতাঁর কাটা এবং সদ্যজাত শিশুকে দুধ পান করাও খোদায়ী ওহীর সাহায্যে শিখিয়ে দেয়া হয়। উদ্ধৃত প্রথম আয়াতটিতে আল্লাহ তায়ালা মৌমাছিকে তাদের বাসগৃহ নির্মাণস্থানসহ মধু সংরক্ষণের শিক্ষা দিলেন। মৌমাছি ওহীর নির্দেশনা অনুযায়ী তার গৃহ নির্মাণ করে। এ ব্যাপারে তাদের বসবাসের জন্য অন্য কোন উপায় উদ্ভাবনের বিকল্প চেষ্টা শুরু করেনি। দ্বিতীয় আয়াতটি মধূ আহরণ পদ্ধতির নির্দেশনা প্রদান করে বলা হলো যে তোমরা সব রকমের ফুল-ফলের রস চুষে নাও এবং তোমার “রবের নির্ধারিত পথসমূহে চলতে থাক। আল্লাহ তায়ালার এ নির্দেশ মৌমাছি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে থাকে। রব এর নির্ধারিত পথ বলতে মৌমাছি মধু সংগ্রহের জন্য এদের একটি দল যে সব নিয়ম পন্থায় কাজ করে সে সব নিয়ম পন্থার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। এদের ছাতা বা মৌচাকের ধরণ, গঠন পদ্ধতি, দল গঠন ও কর্ম বন্টন, কর্মীদলের শৃঙ্খলা মধু সংগ্রহের জন্য তাদের ক্রমাগত ও নিয়মিত আসা যাওয়া করা মধু তৈরি করে ক্রমশঃ সঞ্চয় করতে থাকা এ সবই হচ্ছে সে নিয়মের কাজ যা তাদের জন্য তাদের রব এমনভাবে সুবিন্যস্ত ও সুগম করে দিয়েছেন যে সে জন্য তারেদকে সামান্যতমও চিন্তা ভাবনা বা গবেষণা করে নির্ধারণ করতে হয় না। এ সব কিছুর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বিধি বিধান ও নিয়ম পদ্ধতি রয়েছে। যুগ যুগ ধরে সে নিয়ম ও বিধান অনুযায়ী এ অসংখ্য কোটি মৌমাছি ক্ষুদ্রকার মধু তৈরির কারখানার কাজ করে যাচ্ছে। এর ব্যতিক্রম কিছু করার কোন প্রয়োজন মৌমাছিদের হয় না।

আয়াতে অতঃপর বলা হয়েছে যে, এ মক্ষিকার ভিতর নিরাময়তা রয়েছে। মধু যে একটি উপাদেয় উপকারী ও সুস্বাদু খাদ্য তা মানুষের দৈহিক পুষ্টি বিষয়ক গবেষণার ফলে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে যে বিভিন্ন প্রকার রোগ ব্যধির নিরাময়তা রয়েছে তা ও গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে ফুল-মধু ও ফলের রস। গ্লুকোজ ও খুব ভাল অবস্থায় বর্তমান থাকে। এছাড়াও মধুর আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল এই যে ইহা নিজে পচেনা এবং অন্য পচনশীল বস্তুকেও উহা একটি মেয়াদ পর্যন্ত সুরক্ষিত করে রাখতে পারে। মধু ঔষধ তৈরির কাজেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দুনিয়ায় ঔষধ প্রস্তুদের ব্যপারে যুগ যুগ ধরে মধু এলকোহল ¯িপ্রট এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

——————————————

*লেখকঃ

চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার (অবঃ), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *