যমুনা তীরবর্তী চরাঞ্চলের কলা চাষীদের দুর্দিন

এ কিউ রাসেল

একদিকে বন্যায় মারে, অন্যদিকে চোরের দল। আমাগোরে যাওয়ার জায়গা কই। এভাবে কলা চাষ করে লোকসান গুনে আর কতদিন। ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বললেন টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার গোহালিয়াবাড়ি ইউনিয়নের দৈবকগাতি গ্রামের কলা চাষী মহসিন তালুকদার। তার কথার সূত্র ধরে নানা অভিযোগ আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা জানা গেল স্থানীয় কলা চাষীদের মুখে।

সরেজমিনে কালিহাতি উপজেলার দৈবকগাতি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কলার বাগান ও কলা চাষীদের করুণ অবস্থা। এদের কারো কারো নিজের জমি থাকলেও বেশির ভাগ লোকই বর্গাচাষী অথবা লিজ নেওয়া জমিতে কলা চাষ করেছে। এদের কেউ কেউ ধার-দেনা ও ঋণ করে কলা চাষ করেছে। বিগত বন্যার পানিতে চাষ করা কলার সিংহভাগ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এই উপজেলার যমুনা তীরবর্তী চরাঞ্চলের মানুষগুলো। বেঁচে থাকার জন্য আয়ের একমাত্র উৎস এই কৃষি ফসলটি বিনষ্ট হওয়ায় এখন কেবল হতাশায় দিন গুনছেন চাষিরা। এর সাথে যোগ হয়েছে চোরের উপদ্রব। একদিকে বন্যার রাক্ষুুসে থাবা। অন্যদিকে রাতের বেলা কলার বাগানে চোরদের হানা। দুইয়ে মিলে উভয় সঙ্কটে পড়েছে অসহায়, দরিদ্র এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো। আবার বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ছত্রাক সংক্রমণ হয়ে মরে গেছে অনেক কলা গাছ। যে কলাগাছগুলো অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলোর ও রুগ্নদশা। ফলে কলা গাছ ও ছরিগুলো (কাদি) আকারে অনেক ছোট। কলার আকৃতিও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। অর্থাভাবে কীটনাশক ¯েপ্র না করার কারণে মশার আক্রমণে কলার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে।

কলা চাষী মফিজ উদ্দিন বলেন, একশ’ ২০ শতাংশ জায়গায় কলার আবাদ করেছিলাম। খরচ হয়েছিল প্রায় ৩৫ হাজার টাকার মতো। এবারের বন্যায় প্রায় পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে উঠা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বন্যা আর চোরের সাথে মরার উপর খরার ঘা হয়ে দাড়িয়েছে কলা গাছে ছত্রাকের আক্রমণ। বন্যার পর যে গাছগুলো ছিল তার অধিকাংশেই ছত্রাকের সংক্রমণে মরে যাচ্ছে। এই এলাকার প্রায় ২৫০ টি পরিবারের কেউ না কেউ কলা চাষের সাথে জড়িত।

 

মো. মজিবর শেখ জানান, তার একশ’ শতাংশ জায়গায় কলার আবাদে খরচ হয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা। গেল বন্যায় ১২ আনা কলা গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। যতটুকু রয়েছে, তাতেও ছত্রাকের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। এদের মতো মফিজ উদ্দিন, লুৎফর আকন্দ, মাজেদ আকন্দ, কদ্দুছ তালুকদার, জুড়ান শেখ, হায়দার আকন্দসহ প্রায় প্রত্যেক কলা চাষীই কম-বেশি এমন ক্ষতির সম্মুখীন। সব মিলিয়ে এবার ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে কলা চাষীদের। এদের দেখার যেন কেউ নেই।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ওই এলাকার মাটিগুলো কলা চাষের উপযোগী। এখানে ‘মদনি’ জাতের কলা বেশি চাষ হয়। এই কলা দেখতে অনেকটা ‘সবরি’ কলার মতো। খেতে সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণ ভাল থাকায় এই কলার চাহিদা অনেক। প্রাপ্ত বয়স্ক কলা গাছের চারা রোপন করলে এক বছর পর কলা বাজারজাত করা যায়। এখানকার কলা টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়ে থাকে।

গোহালিয়া বাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মতিউল আলম তালুকদার চোরের উপদ্রবের কথা স্বীকার করে বলেন, এই ইউনিয়নের প্রায় চল্লিশ ভাগ মানুষ কলা চাষ করে থাকে। যার সাথে জড়িয়ে আছে কয়েক হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা। এ বছর নদী ভাঙন কবলিতদের জন্য কিছু সরকারি সহায়তা পেয়েছি। তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ দরিদ্র কলা চাষীদের জন্য কোন বরাদ্দ পাইনি। কালিহাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. মোহিত কুমার দে বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ কলাচাষীদের জন্য সরকারি কোন অর্থ সহায়তা না থাকলেও আমরা তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ পরামর্শ দিয়ে থাকি। বন্যার পর যে গাছগুলো রয়েছে সেখান থেকে ভাল ফল পাওয়া যাবে না। আবার অপ্রতিরোধ ছত্রাকের সংক্রমণ। সব মিলিয়ে আমরা তাদের নতুন করে কলা চাষের পরামর্শ দিচ্ছি।

লেখক : মানবাধিকার কর্মী

গোপালপুর, টাঙ্গাইল।

 

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

One Comment on “যমুনা তীরবর্তী চরাঞ্চলের কলা চাষীদের দুর্দিন”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *