লটকন : দেশী ফলের বিদেশ বাজার

 

এস এম মুকুল

অপ্রচলিত জংলি ফল হিসেবে পরিচিত হলেও লটকন এখন অর্থকরী ফল। পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি লটকন ফলটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ঠাঁই করে নিয়েছে। ইতোমধ্যে লটকন অপ্রচলিত ফল পণ্য হিসেবে রপ্তানি করা হয় বিভিন্ন দেশে। লটকন চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেনÑ এস এম মুকুল

নাম তার লটকন। বাংলাদেশের সুপরিচিত অপ্রচলিত দেশীয় টক-মিষ্টি ফল লটকন। এটি আকর্ষণীয় মুখরোচক ফল। সাধারণত লটকন হিসাবেই অধিক পরিচিত। ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ টক-মিষ্টি স্বাদের ফল লটকনের এখন ভরা মওসুম। ঢাকা শহরসহ সারা দেশেই এখন এই ফল পাওয়া যায়। লোভনীয় রং ও আকৃতির থোকা এই লটকন। লটকন ফল গোলাকার এবং পাকলে হলুদ বর্ণ ধারণ করে। ফল হিসাবে লটকন যেমন পুষ্টিমানে ভরপুর তেমনি ক্যালসিয়াম, ক্যারোটিন ও খনিজ লবণে সমৃদ্ধ।

 

যার বাংলা নাম- লটকন বা লটকা। ইংরেজী নাম- Burmese grape, বৈজ্ঞানিক নাম- Baccaurea ramiflora  লটকনের স্থানীয় ও বন্য অনেক জাত থাকলেও অনুমোদিত জাত হল বারি লটকন-১। বারি লটকন-১’ জাতটি বাংলাদেশে চাষের জন্য ২০০৮ সালে অনুমোদন করা হয়। এটি একটি মাঝ মৌসুমী জাত। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে এর ফল পরিপক্কতা লাভ করে। এটি একটি নিয়মিত ফলদানকারী উচ্চ ফলনশীল জাত। লটকনের এ জাতটি বাংলাদেশের সর্বত্র চাষ উপযোগী। লংগান এর অপভ্রংশ থেকেই লটকন নামটি এসেছে। Meliaceae পরিবারের এই ফলটির আদি বাস পশ্চিম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুমাত্রা, বার্মা (মিয়ানমার), থাইল্যান্ড ও ভারতে লটকনের উৎপাদন অনেক বেশি।

বর্ষাকালীন ফল লটকন বাংলাদেশে দিনে দিনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলের দোকানের ঝুড়িতে সাজানো বা দড়িতে ঝুলানো থোকায় থোকায় হলদে সবুজাভ রঙের পৃায় গোলাকার ফলগুলো সবার নজর কাড়ে। এদেশের আবহাওয়াতে এর গরপড়তা ফলনও বেশ ভালো। ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে শুরু করে বর্তমানে নরসিংদীসহ দেশের অনেক জায়গাতেই লটকনের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশেই এটার বাণিজ্যিক চাষ সম্ভব।

এক সময় লটকনকে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ফল মনে করা হতো না বাংলাদেশে। কিন্তু এর স্বাদ, পুষ্টিগুণ, ঔষধিগুণ ইত্যাদি প্রকাশ পাওয়ায় তা এখন শুধু অতি পরিচিত ফলই নয় বরং অতি প্রয়োজনীয় ফলে পরিচিতি লাভ করেছে। লটকনকে এখনো বাংলাদেশের অপ্রচলিত ফল মনে করা হয়। এর উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি বেশ উপযোগী।

১০-১৫ বছর আগেও লটকনের তেমন চাহিদা ছিল না। দামও ছিল কম। সে জন্য কেউ লটকনের স্বতন্ত্র বাগান করার চিন্তা করত না। বর্তমানে টক মিষ্টি সুস্বাদু এ ফলের চাহিদা ও দাম দুটিই বেড়েছে। এমনকি অন্যান্য ফল চাষের তুলনায় লটকন চাষ অনেক বেশি সহজ এবং ফলনও বেশি হওয়ায় চাষিরা বেশি লাভবান হচ্ছে। লটকন গাছের কান্ডে ফলে। গাছের পুষ্টির সুষমতা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছের গোড়া থেকে প্রধান কান্ডগুলোতে এত বেশি ফল আসে যে, একটি পূর্ণবয়স্ক লটকন গাছে ৫ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। তখন গাছের কান্ড বা ডাল দেখা যায় না। মানভেদে লটকন মণপ্রতি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করা হয়ে থাকে। পাইকাররা নিজেরাই বাগান থেকে লটকন ক্রয় করে থাকেন। বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং নরসিংদী জেলাতে ইদানীং লটকনের বাণিজ্যিক চাষ হলেও দেশের অন্যান্য জায়গাতে তেমনভাবে এর আবাদ এখনো শুরু হয়নি। বাংলাদেশের আদ্র আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য বেশ উপযোগী। তাই সারা দেশেই (নিচু এলাকা বাদে) এর বাণিজ্যিক চাষ করা সম্ভব। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে একটা পূর্ণ বয়স্ক লটকন গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে ১০০ কেজি পর্যন্ত লটকন সংগ্রহ করা সম্ভব। বাজার দরও বেশ ভালো। প্রতি কেজির পাইকারি দর প্রায় ৬০ থেকে ৮০ টাকা । কাজেই কারো বাগানে ১০টি লটকন গাছ থাকলে প্রতি মৌসুমে সহজেই ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।

নরসিংদী : নরসিংদীর শিবপুরে লটকন চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন অনেক চাষি। জয়নগর, বঘাব ও যোশর ইউনিয়নসহ সবকটি ইউনিয়নে প্রায় ৪৭৫ হেক্টর জমিতে ছোট-বড় মিলে ২ হাজার ৯৫৫টি লটকন বাগান রয়েছে। এদের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে উপজেলার মানুষ-জনের মধ্যে লটকন চাষে আগ্রহ বাড়ছে। প্রতিবছরই বাড়ছে বাগান। ফলন হচ্ছে প্রচুর। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন শত শত মণ লটকন সরবরাহ হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে। এখানকার লটকন মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

জয়নগর : উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, লটকন চাষে পরিশ্রম ও খরচ দুটোই কম। তাই উপজেলার লটকন চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। ফলে উপজেলায় দিন দিন লটকনের চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জয়নগর, বাঘাব ও যোশর ইউনিয়নসহ সবকটি ইউনিয়নে পৃায় ৪৭৫ হেক্টর জমিতে ছোট-বড় মিলে প্রায় ২ হাজার ৯৫৫টি লটকন বাগান রয়েছে। ১০-১৫ বছর আগেও লটকনের তেমন চাহিদা ছিল না। দামও ছিল কম। সেজন্য কেউ লটকনের বাগান একা করার চিন্তা করতো না। মান ভেদে লটকন মণ প্রতি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হয়ে থাকে। পাইকাররা নিজেরাই বাগান থেকে লটকন ক্রয় করে থাকেন। কিশোরগঞ্জের জয়নগর গ্রামে লটকন চাষে স্বাবলম্বী হয়েছে অনেক চাষী। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন শত শত মণ লটকন সরবরাহ করা হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে। এখানকার লটকন মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের রফতানি হচ্ছে।

গৌরীপুরের লটকন : ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের বড়বাগ, কিসমত বড়ভাগ, স্বল্প বড়ভাগ, গোবিন্দ নগর, রামজীবনপুর, কাশিমপুর, ইয়ারপুর, অচিন্তপুর ইউনিয়নের খালিজুরী, মখুরিয়া গৌরীপুর সদর ইউনিয়নের কোনাপাড়া, শালিহর, হাটশিরা, মাওহা ইউনিয়নের বীর আহাম্মদপুর, নাহড়া গাগলা, সহনাটি ইউনিয়নের সোনাকান্দি, ঘাটেরকোনা পাছার, লংকাখলা, খান্দার, সিংরাউন্ধ, আমুদপুর রাইশিমূল, ধোপাজাঙ্গালীয়া, ঝলমলা, করমরিয়া, রামগোপালপুর ইউনিয়নের গোপিনাথপুর গ্রামসহ বিচ্ছিন্নভাবে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের ৮০ হেক্টর জঙ্গলাকীর্ণ জমিতে ছোট-বড় প্রায় আড়াইশ লটকন ফলের বাগান রয়েছে।

জানা গেছে, কয়েক দশক ধরে উল্লেখিত গ্রাম গুলোতে লটকন ফল-কৃষি নির্ভর বিশাল একটি জনগোষ্টির বিভিন্ন ধরনের আর্থিক চাহিদার যোগান দেয়াসহ অনেকের সংসারে এনে দিয়েছে স্বচ্ছলতা, তাদের করেছে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী।

এক্ষেত্রে বিনা পরিশ্রম ও মূলধন বিহীন এ মৌসুমী আয় দেশের অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যয় ও আয়ের সাথে কোন অবস্থাতেই তুলনা করা সম্ভব নয় বলে লটকন বাগানের মালিকরা জানিয়েছেন।

কৃষির উপর নির্ভরশীল বৃহৎ জনগোষ্টীর এলাকা ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের প্রায় ২ শতাধিক পরিবারের বিশাল অর্থ ভাগ্যে খুলেছে মৌসুমী ফল লটকন বিক্রি করে। কোন প্রকার চাষাবাদ ও পরিচর্যা ছাড়াই পৃকৃতিগতভাবে জন্ম নেয়া পুষ্টিগুণে ভরপুর দেশীয় লটকন ফল (বুবি) বাগানের মালিকরা কয়েক দশক ধরে প্রতি মৌসুমে শুধু লটকন ফল বিক্রি করে ঘরে তুলছেন লাখ লাখ টাকা। এ বছর উপজেলায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা মেঃ টন দরে লটকন ফল বিক্রি করে বাগান মালিকদের ঘরে উঠবে প্রায় ৪ কোটি টাকা।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, লটকন ফল পাকার অনেক আগে থেকেই দুর-দুরান্ত থেকে লটকন ব্যবসায়ীরা দল বেঁধে লটকন প্রসিদ্ধ গৌরীপুর উপজেলায় আসতে শুরু করে। ব্যবসায়ীরা লটকন গাছে কুড়ি লটকন দেখেই মালিকের কাছ থেকে আগাম টাকায় লটকন বাগান কিনে নেন। দীর্ঘ সময় পর লটকন পাকা ধরলে তা গাছ থেকে নামিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে শুরু করে ব্যাবসায়ীরা।

কুড়িগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ : কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই, সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ও মোগলবাসাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়েছে লটকনের। কৃষকরা বলছেন, অল্প খরচেই গড়ে তোলা যায় লটকনের বাগান। ৩৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৪ হাজার গাছের প্রতিটি গাছেই গোড়া থেকে মগ ডাল পর্যন্ত থোকা থোকা লটকন ধরেছে। অন্যান্য বারের চেয়ে এবার ফলের আকারও হয়েছে বড়। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার লটকন চাষীদের মতে, ‘বিনা পরিশ্রম এবং খরচ না থাকায় আমি বাড়ির পাশে পতিত জমিতে লটকনের বাগান থেকে গত বছর প্রায় ১ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছি। এ বছর ১ লাখ টাকার বেশি লটকন বিক্রি হবে।’ কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক পৃতীপ কুমার মণ্ডল জানান, লটকন চাষের মধ্য দিয়ে জেলার কৃষিচিত্র অনেকটাই পাল্টে যাবে। কারণ এ জেলার মাটি লটকন চাষের উপযোগী। যে কোনো জায়গায় লটকনের গাছ হলেই প্রচুর লটকন ধরে। এজন্য আলাদা কোনো যতœ করতে হয় না।

বিশেষজ্ঞের মত : কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি জমে না সেই সব উচুঁ স্থানের ঘন ঝোপ-জঙ্গলে ও বাঁশঝাড়ের নিবির ছায়ায় লটকন ফলের (আঞ্চলিক ভাষায় বুবি) গাছ আপন-আপনি বংশ বিস্তার করে থাকে। বিশেষ করে পাকা লটকন ভক্ষনকারী নিশাচর পশু ও পাখির বিষ্টা থেকেই বেশী বংশ বিস্তার ঘটে লটকন ফল গাছের। চাষীরা জানিয়েছেন, এর বীজ মাটিতে পড়লেই অতি সহজেই চারা গজিয়ে থাকে। এক কালের চাহিদা বিমূখ লটকন ফল কালের আবর্তে এখন সকলের চাহিদা সম্পন্ন ও ব্যাপক অর্থকরী ফল হিসাবে এলাকায় অত্যাধিক গুরুত্ব বহন করছে। ফলে এখন এর সম্প্রসারণ করতে অনেক চাষীই নতুন করে লটকন ফলের বাগান সৃষ্টি‘র চেষ্টা চালাচ্ছে।

এক সময়ের জঙ্গলি ফল হিসেবে পরিচিত লটকন এখন কুড়িগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। এর ফলন যেমন ভালো হয়, তেমনি দামও পাচ্ছেন কৃষকরা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে কুড়িগ্রামের উৎপাদিত লটকন এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে।

অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন ও ফরমালিনমুক্ত তুলনামূলক কম দামের এ ফলের চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। এ কারণে লটকন বিক্রি করে লাভবান হয়েছেন কৃষকরা। বর্তমান বাজারে লটকন মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়।

লটকন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন এ ফল পরে বাছাই হয়ে ইংল্যান্ড, কাতার, সৌদিআরবসহ নানান দেশে রপ্তানি হয়। কৃষি বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরামর্শে এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক-এর সহায়তায় প্রতিটা জেলাতেই লটকনের বাণিজ্যিক চাষাবাদ করা যেতে পারে। আর এ কাজে বেকার যুবকদের সম্পৃক্ত করা যায়। দেশের বাজারে যেমন এর চাহিদা রয়েছে তেমনি বিদেশেও এর প্রচুর চাহিদা। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোসহ সবারই এদিকে নজর দেয়া উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *