লবণাক্ত মাটিতে সোনালি আঁশ

নাহিদ বিন রফিক

লবণাক্ত এলাকায় ফসল উৎপাদনে যথেষ্ঠ অন্তরায়। বিশেষকরে খরিফ-১ মৌসুমে এসব স্থানে অধিকাংশ কৃষক অনেকটা বেকার বসে থাকেন। কেউ কেউ সামান্য চাষাবাদ করেন। তবে লবণাধিক্যের কারণে উৎপাদন অনেকাংশে ব্যাহত হয়। ফলে তারা কাজে আগ্রহ হারান। তবে গত বছরের পাটের ফলন চাষিদের বেশ অবাক করেছিল। দামও পেয়েছিল বেশ। সে কারণে তারা এখন খুশিতে আত্মহারা। লবণাক্ততার প্রভাবে যেসময় ফসলই হয় না; সেখানে পাটের সর্বোচ্চ ফলন। এতো স্বপ্নের মতো। এবার অভাব ঘুঁচাবে সোনালি আঁশ। এসব কথা এখন ওখানকার কৃষকের মুখেমুখে।

মাটি, জাত এবং বিজেআরআই’র কার্যক্রম নিয়ে কিছু কথা

দেশের মোট চাষ উপযোগি জমির শতকরা ৩০ ভাগ উপকূলীয় বিভিন্ন অঞ্চলে  বিস্তৃত। এর পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন হেক্টর। এসব জমির মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন হেক্টর লবণাক্ত। দিন দিন এর  মাত্রা বেড়েই চলছে। এ বিশাল পরিমাণ জমি খরিফ-১ মৌসুমে লবণাক্ততার কারণে পতিত থাকে। উপকূলীয় জেলাগুলোর মধ্যে পটুয়াখালীতে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ১ লাখ ৫৫ হাজার ১শ’ ৮০ হেক্টর,  সাতক্ষীরায় ১ লাখ ৫৩ হাজার ১ শ’ ১০ হেক্টর, খুলনায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯ শ’ ৬০ হেক্টর, বাগেরহাটে ১ লাখ ৩১ হাজার ১ শ’ ২০ হেক্টর, বরগুনায় ৫২ হাজার ৫ শ’ ২০ হেক্টর, ভোলায় ৯৪ হাজার ৫ শ’ ৭৯ হেক্টর, কক্সবাজারে ৫৫ হাজার ৩ শ’ ৫০ হেক্টর, নোয়াখালীতে  ৫২ হাজার ৫ শ’ ২০ হেক্টর, চট্টগ্রামে  ৫১ হাজার ৪ শ’ ৮০ হেক্টর এবং পিরোজপুরে ৩৫ হাজার ৮ শ’ ৩০ হেক্টর জমি। এসব লবণাক্ত জমিগুলো  খরিফ-১ মৌসুমে পাট চাষের আওতায় আনার জন্য ২০১৫Ñ২০১৬ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ পাট গবেষণা  ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) ‘পাট ও পাট  জাতীয়  ফসলের  কৃষি  প্রযুক্তি  উদ্ভাবন ও হস্তান্তর’ প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে উপকূলীয় ৬ উপজেলায় মধ্যম লবণ সহিষ্ণু (৯ডিএস./মিটার) পাটের জাত এবং উচ্চ লবণ সহিষ্ণু ৪টি লাইনের মাঠ পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম চলমান আছে। উপজেলাগুলো হলো: পটুয়াখালীর কলাপাড়া, বরগুনার বেতাগী, পিরোজপুরের নাজিরপুর, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ, খুলনার দাকোপ ও সাতক্ষীরা সদর। এসব উপজেলাগুলোতে ২০১৫Ñ২০১৬ এবং ২০১৬Ñ২০১৭ অর্থবছরে প্রতিবার ৬০০ জন চাষির প্রত্যেককে ১০ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলক পাটের প্রদর্শনী দেয়া হয়েছিল। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে উপকূলীয় ছয় উপজেলায় ইতোমধ্যে ২৫ টি করে  মোট ৩ শ’প্লট নির্বাচন শেষ । এখন চলছে বীজসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ বিতরণের কাজ। বিজেআরআই’র  মহাপরিচালক ড. মো. মঞ্জুরুল আলম প্রকল্পের এসব কার্যক্রম সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন। এরই অংশ হিসেবে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই অন্যান্য এলাকার পাশাপাশি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গায় স্থাপিত আজিজুল ইসলাম এবং শহিদ হাসান তমালের প্রদর্শনীপ্লট পরিদর্শন করেছিলেন। পাটের ফলন দেখে তিনি অবিভূত হন। এসময় কৃষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “লবণাক্ত জমিতে ফসল উৎপাদনের জন্য  লবণসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করেছি। খরিফ-১ মৌসুমে জমি খালি না রেখে সেখানে আউশ ধান করুন, সেই সাথে পাটও লাগান। আমরা আপনাদের পাশেই আছি।” একই উপজেলার রঘুনাথপুরের আছলাম শিকদারের প্লটে আবাদকৃত পাটের ফলন আরো আকর্ষণীয়। তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, “আমার জমির অধিকাংশ পাট গাছের উচ্চতা ১২ থেকে ১৪ ফুট, ব্যাস ৩০ থেকে ৩২ মিলিমিটার। প্রতিটি পাটের ওজন প্রায় ৬ শ’ ৫০ গ্রাম।”  কৃষক আরো বলেন, “ আউশ মৌসুমে এখানে কোনো ফসল হতো না। উপজেলা কৃষি অফিস এবং পাট গবেষণার কর্মকর্তাদের পরামর্শে এবার পাট চাষ করেছি, ফলনও পেয়েছি অনেক।”  গবেষণার ফলাফল প্রসঙ্গে জাত উদ্ভাবক এবং উপ-প্রকল্প পরিচালক (গবেষণা) ড. মাহমুদ আল হোসেন জানান, “বিজেআরআই দেশী পাট-৮ জাতটি লবণাক্ত এলাকার জন্য খুবই উপযোগি এবং এর উৎপাদনও অনেক বেশি। সময়মতো বীজ বপন, সুষম সার ব্যবহার, সঠিক পরিচর্যা এবং রোগ-পোকা দমন করলে ফলন যে কাক্সিক্ষত হয় তা কৃষকরা প্রমাণ করেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে চাষযোগ্য জাত উদ্ভাবনের জন্য আমরা উচ্চ লবণসহিষ্ণু ( ১৪ ডিএস/ মিটার ) চারটি লাইন নির্ধারণ করেছি। এগুলো হলো: C12221, C12033, C2593 এবং C3473। সাগরকন্যা কুয়াকাটার সমুদ্রতীরবর্তী উচ্চ লবণাক্ত জমিতে পরীক্ষামূলক তিনটি প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে, যার লবণাক্তের মাত্রা প্রতি মিটারে ১২.৬ ডিএস.। সেখানেও ফলন ভালো হয়েছে।”

পাটের ব্যবহার

পাটের ব্যবহার ঠিক কখন থেকে শুরু হয়েছিল তা বলা মুশকিল। তবে ইতিহাসের পাতা উল্টালে জানা যায়, মুঘল আমলে ভারতবর্ষের কিছু মানুষ পাটের তৈরি পোশাক পরিধান করতো। এরও আগে পশ্চিমবঙ্গে পাটের রশি এবং সুতলি ব্যবহারের কথা শুনা যায়। পাটের ব্যবহার বহুমুখী। তৈরি হয় সুতা, চট, বস্তা, শিকা,  চটের ব্যাগ, ল্যাপটপের ব্যাগ, মাদুর, গালিচা, জায়নামাজ, টুপি, টেবিল ম্যাট, বিছানার চাদর, শাড়ি, বিভিন্ন শীতের পোশাক, তৈজসপত্র, আসবাবপত্র, শো-পিস, বসার গদি, দেয়াল-আচ্ছাদন, গৃহসজ্জার সামগ্রি, পর্দার কাপড়, কুশনকভার দোলনা, মেয়েদের গহনা, পার্স, মানিব্যাগ, বেল্ট, বাহারি খেলনা, পার্টিকেল বোর্ড, কাগজের মন্ডসহ আরো অনেক জিনিস। পাটের আঁশে পলিথিন ব্যাগ তৈরি হচ্ছে। এমনকি ঢেউটিনও। পাটখড়ি দিয়ে ঘরের বেড়া এবং ছাউনি তৈরি হয়। পানের বরজ, জ¦ালানী হিসেবে এবং কাগজ  তৈরিতেও এর ব্যবহার সমাদৃত। পাটের পাতা শাক হিসেবে উৎকৃষ্ট। খেতে সুস্বাদু। পুষ্টিকরও বটে। সে সাথে  ঔষধিগুণে ভরপুর। টিউমার ও ক্যান্সার প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে। পাতার রস বাতের জন্য বেশ উপকারি।  ক্ষুদামন্দা, উদরাময়, আমাশয় এবং অম্লরোগের মহৌষধ। তবে সব ধরণের পাটের পাতা খাওয়া যায় না।

পাটের বাজার

বাংলার পাট বিশ^পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। ভারত, চীন, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, মিশর ও বেলজিয়ামে পাটের সুতা রফতানি হয়। তবে মোট রফতানির শতকরা ৪০ ভাগই হচ্ছে তুরস্কে। কাঁচা পাট রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে ভারত, চীন ও পাকিস্তান অন্যতম। এছাড়াও রয়েছে থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন, ইংল্যান্ড, মিশর, জাপান, ভিয়েতনাম, ইথওপিয়া এবং আইভেরিকোস্ট।

বীজ বপন

জমি উত্তমরূপে কর্ষণ শেষে বিজেআরআই দেশী পাট-৮’র বীজ বপন করতে হবে। লাইন পদ্ধতিতে চাষ করা উত্তম। এতে অনেক সুবিধা। বীজ কম লাগে। পরিচর্যা করতে সহজ হয়। রোগপোকার আক্রমণ কম হয়। ফলনও হয় বেশি। এক্ষেত্রে লাইন হতে লাইনের দূরত্ব ১ ফুট এবং বীজ হতে বীজের দূরত্ব হবে ৩/৪ ইঞ্চি। হেক্টরপ্রতি বীজ লাগবে ৪/৫ কেজি।                          বীজ বপনের সময় হচ্ছে মার্চের শেষ সপ্তাহ হতে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত।

সার ব্যবস্থাপনা

যেকোনো ফসলের কাঙ্খিত ফলন পেতে সুষম সার ব্যবহার জরুরি। পাটের বেলায়ও তেমনি। চাষের ক্ষেত্রে হেক্টরপ্রতি  সার দিতে হবে পচা গোবর ৫০০ কেজি,  ইউরিয়া ৭৫ কেজি, টিএসপি ৪৫ কেজি, এমওপি ৩৭ কেজি, জিপসাম ১০ কেজি এবং জিংক/ দস্তা ১৫ কেজি। ইউরিয়া বাদে অন্য সারের সম্পূর্ণ অংশ শেষ চাষের সময় জমিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সার সমান দু’ভাগ করে জমিতে নিড়ানি দিয়ে বীজ বপনের ৩ সপ্তাহ পর একবার এবং ৬ সপ্তাহ পর আরেকবার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

পরিচর্যা

আগাছা খাবারে ভাগ বসায়। ক্ষতিকর পোকার আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার হয়। তাই পাটক্ষেত সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। খাদ্য তৈরির জন্য পানি গাছের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। সেজন্য খরা দেখা দিলে হালকা সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। চারা ঘন হলে পাতলা করতে হয়।

রোগ ও পোকামাকড়

পাটে বিভিন্ন রোগ হতে পারে। এগুলো হলো: ঢলে পড়া, গোড়া পচা, কালোপট্টি,অ্যানথ্রাকনোজ এবং মোজাইক। পাটের ক্ষতিকর পোকার মধ্যে বিছা পোকা, ঘোড়া পোকা, উঁড়চুঙ্গা, কাটুই পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, কাতরী পোকা, ছাতরা পোকা, কান্ডের উইভিল অন্যতম। মাকড়ের মধ্যে রয়েছে লাল মাকড় ও সাদা মাকড়। তবে লবণসহিষ্ণু জাত ও লাইনগুলোতে এপর্যন্ত তেমন একটা রোগপোকা দেখা যায়নি। তারপরও রোগ এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

ফসল সংগ্রহ ও ফলন

সময়মতো ফসল সংগ্রহ না করলে পাটের উৎপাদন এবং গুণগতমান কমে যায়। তাই গাছে দ’ুএকটি ফুল বের হলে কাটার ব্যবস্থা করতে হবে। কাটার পর আঁটি বেঁধে জমিতে ৩/৪ দিন ফেলে রাখতে হয়। এরপর পরিষ্কার পানিতে জাগ দিতে হবে। রিবনরেটিং পদ্ধতিতে পাট পচানো যায়। জাগ দেয়ার আগে পাটের গোড়া থেতলিয়ে নিতে হবে। এরপর আঁটিগুলোকে লম্বালম্বিভাবে সাজাতে হয়। আরেক স্তর আড়াআড়ি সাজাতে হবে। স্তরের সংখ্যা হবে পানির গভীরতা অনুযায়ী। আঁটি ডুবানোর ক্ষেত্রে কলাগাছ, মাটির ঢেলা, কাদামাটি এসব ব্যবহার করা যাবে না। এক্ষেত্রে সিমেন্টের স্লাব ব্যবহার উত্তম। তবে গাছের গুঁড়ি দেয়া যেতে পারে। চারপাশে খুঁটি পুঁতে বাঁশের সাহায্যেও ডুবানো যায়। মুদৃ ¯্রােত আছে এমন জলাশয়ে পাট পচানোর জন্য ভালো হয়। এতে আঁশের রঙ উজ্জ্বল হবে। পচনক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে প্রতি ১শ’ আঁটির জন্য ১ কেজি হারে ইউরিয়া একটি পাত্রে গুলিয়ে পানিতে মিশিয়ে দিতে হয়। আঁটিতেও ইউরিয়া ছিটিয়ে দেয়া যায়। ১৪Ñ১৬ দিন পর পচনক্রিয়া শেষ হলে পানি থেকে উঠিয়ে আঁশ পৃথকীকরণের কাজ দ্রুত সেরে ফেলতে হবে। এরপর পরিষ্কার পানিতে খুব ভালো করে আঁশ ধুয়ে নিতে হয়। আঁশের রঙ কালো হলে ১ কেজি পরিমাণ পাকা তেঁতুল ৪০ লিটার পানিতে গুলিয়ে আঁশগুলো ৫/৬ মিনিট ভিজিয়ে রেখে পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে শুকালে রং উজ্জ্বল হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে তেঁতুলের কোনো অংশে যেন আঁশে লেগে না থাকে। পাটের আঁশ মাটিতে শুকানো যাবে না। হতে পারে বাঁশের আড়া, ঘরের চাল কিংবা ব্রিজের রেলিং অথবা অন্য কোনো উপায়। অবশ্যই উত্তমরূপে শুকানো চাই। এরপর বিপণন কিংবা গুদামজাতকরণ। গত বছরে এর গড় ফলন হয়েছিল হেক্টর প্রতি ৩ টন।

একসময় বাংলার পাট ছিল বিশে^র সেরা পণ্য। মাঝখানে দুর্দিন গেলেও এর কদর আবারও বাড়তে শুরু করেছে। রফতানি হচ্ছে বড় পরিসরে। দেশের অভ্যন্তরেও সম্প্রসারিত হচ্ছে বেশ। এরই অংশ হিসেবে সরকার ১৭টি পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। পাট আমাদের ইতিহাস। আমাদের গৌরব। দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে মানানসই পণ্য। বাংলার পাট হবে বিশ^মাত। তাই কবির ভাষায় বলতে হয়Ñ আবার হবে পাটের চাষ, মাঠের পরে মাঠ, পণ্য বিকে অর্থ পেরে গরম করো হাট।

————————————–

লেখকঃ

টেকনিক্যাল পার্টিসিপেন্ট, কৃষি তথ্য সার্ভিস ও পরিচালক, কৃষি বিষয়ক, আঞ্চলিক অনুষ্ঠান, বাংলাদেশ বেতার, বরিশাল।

ই-মেইলঃ tpnahid@gmail.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare