লেবুর যত গুণ

কৃষিবিদ মোঃ নাজমুল করিম

লেবু (কাগজি লেবু/পাতি লেবু/কাগুজি লেবু) আমাদের সকলের পরিচিত। লেবুর ইংরেজী নাম খবসড়হ, বৈজ্ঞানিক নাম ঈরঃৎঁং ষরসড়হ এবং জঁ:ধপবধব পরিবারভূক্ত ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ কি জাতীয় ফল। বাংলাদেশের সর্বত্র লেবু পাওয়া যায় এবং চাষ করা যায়। ভিটামিন-সি অতি সহজেই পানিতে দ্রবিভূত হয় এবং বাতাসের সংস্পর্শে জারিত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। ভিটামিন-সি শরীরে জমা থাকে না। তাই প্রতিদিন খেতে হয়। ভিটামিন-সি এর প্রধান কাজ চামড়াকে মসৃন উজ্জল রাখে, দাঁত ও মাড়ি সুস্থ রাখে, ক্ষতস্থান তাড়াতাড়ি শুকাতে সাহায্য করে এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করে। মানব দেহে ভিটামিন-সি এর দৈনিক চাহিদা শিশু ২০ মিলিগ্রাম, প্রাপ্ত বয়স্ক ৩০ মিলিগ্রাম এবং গর্ভবতী ও প্রসূতী ৫০ মিলিগ্রাম। সুতরাং ভিটামিন-সি এর অভাব আমরা অনেকাংশে লেবু দিয়ে পূরণ করতে পারি। লেবুর ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী উপাদানে রয়েছে ৬৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি, ১.৫ গ্রাম আমিষ, ১০৯ গ্রাম শর্করা, ৯০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম, ০.৩ মিলিগ্রাম লৌহ, ১৫ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন-বি। এছাড়াও মানবদেহে লেবুর ব্যবহার বহুমুখী, তার কিছু অংশ উল্লেখ করা হলোঃ

*            লেবু হজমে সহায়তা করে ও কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর করে।

*           লেবুর রস দাঁতের ব্যথা উপশমে, মাড়ির রক্তপড়া দূর করতে, ও মুখের দূর্গদ্ধ দূর করতে কার্যকর।

*           শরীরের ক্ষত দূর করতে ভিটামিন-সি (বা লেবু) সহায়তা করে।

*          লেবুর রস, আদাকুচি ও লবণ মিশিয়ে প্রতিদিন খেলে ৭/৮ দিনের মধ্যে অরুচি ও ক্ষুধামন্দা দূর হয়।

*           লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে খেলে ঠান্ডা ও সর্দি-কাশির উপকার হয়।

*           এক গ্লাস পানিতে লেবুর রস, মধু ও পুদিনার পাতা দিয়ে শরবত তৈরী করে খেলে ত্বকের উজ্জলতা বাড়ে।

*           লেবুর রস-১ চা চামচ, গোলাম জল-১ চা চামুচ, মুলতানী মাটি-১ টেবিল চামুচ ও তুলসী পাতার রস একত্রে মিশিয়ে পুরো মুখে মেখে ২০ মিনিট রেখে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে ত্বক সুস্থ ও উজ্জল হবে।

*           লেবুর রস, ডিমের সাদা অংশ এবং থেতো করা আপেল একত্রে মুখে লাগালে অতিরিক্ত তৈলাক্ততা দূর হয়।

*           লেবুর রস ও বাদামের তেল মিশিয়ে মুখে লাগালে ব্রণ ও ব্লাক হেড দূর করতে সাহায্য করে এবং ত্বক সতেজ ও সুন্দর হয়।

*           লেবুর রস, চিনি এবং অলিভ ওয়েল মিশিয়ে কিছুক্ষণ ত্বকে ম্যাসেজ করে ধুয়ে ফেললে ত্বকের উজ্জলতা বাড়ে।

*           শসা বা আলু পিস করে কেটে এতে লেবুর রস মাখিয়ে প্রতিদিন মুখে ঘষলে মেসতা ও বলিদাগ উঠে যায়।

*         লেবুর রস ও মধু একত্রে মিশিয়ে মুখে ১০ মিনিট রেখে দিয়ে ধুয়ে ফেললে মুখের তৈলাক্ততা দূর হয় ও ব্রণ ভাল হয়।

*          লেবুর রস ও আমড়ার রস একত্রে মিশিয়ে চুলের গোড়ায় লাগিয়ে সারা রাত রেখে পরদিন ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে খুশকী থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

*          শ্যাস্পুর সাথে লেবুর রস মিশিয়ে চুলের গোড়ায় ম্যাসেজ করে ধুয়ে ফেললে খুশকী দূর হয়।

*           লেবুর রস-১০ টেবিল চামচ, টক দই-৪ টেবিল চামম ও ১-টি ডিমের সাদা অংশ একত্র মিশিয়ে পুরো চুলে লাগিয়ে ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেললে খুশকি দূর হয়।

*           লেবুর রস ও বাদামের তেল এক সঙ্গে মিশিয়ে চুলের গোড়ায় আঙ্গুল দিয়ে ঘষে লাগাতে হবে। এতে চুল পাকা কমে।

*           লেবুর রস ও ১-টি গোল আলুর রস একত্রে মিশিয়ে চুলের গোড়ায় লাগালে চুলপড়া কমে যায়।

*           চুল শ্যাম্পু করার পর আধামগ পানিতে ১-টি লেবুর রস ও অল্প ভিনেগার মিশিয়ে চুল ধুয়ে ফেললে চুলের উজ্জলতা বাড়ে।

*           লেবুর রস ও টক দই মিশিয়ে চুলে ব্যবহার করে কিছুক্ষণ পর ধুয়ে ফেলে শ্যাম্পু করতে হবে। এতে চুল উজ্জল হয়।

*           লেবুর রসের সাথে লাউয়ের বিচি বেটে হাত পায়ে ২০ মিনিট রেখে দিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে হাত-পা ঘামা কমে যায়।

*           প্রতিদিন হাল্কা গরম পানিতে লেবুর রস ও লবণ দিয়ে ১০ মিনিট পা ভিজিয়ে রাখলে পায়ের দূর্গন্ধ দূর হয়।

*          একটি পাত্রে উষ্ণ গরম পানি নিয়ে তাতে লেবুর রস, শ্যাম্পু, স্যাভলন ও লবন মিশিয়ে ১০-১৫ মিনিট নখ ভিজিয়ে রাখলে নখের হলদে ভাব দূর হয় ও নখের রং উজ্জল হয়।

*           কাটন লেবু নখে ঘষলে নখের কালদাগ দূর হয়।

*          গোস্ত রান্নার আগে লেবুর রস দিয়ে আধাঘন্টা মাখিয়ে রাখলে দ্রুত সিদ্ধ হয়।

*           কাপড়্রে দাগ তুলতে লেবুর রস খুবই কার্যকরী।

*           আলু, কলা, কচু, আপেল ইত্যাদি কেটে লেবুর রস মেশানো পানিতে ডুবিয়ে রাখলে কালচে/লালচে রং হবে না।

*           কচু, কাচকলা বা কচুর ডাটা কুটলে হাতের আঙ্গুলে কালো দাগ পড়ে যায়। লেবু দিয়ে ঘষলে দাগ সহজেই উঠে যায়।

*          সাদা বোতলে পানি রাখলে তাতে আয়রনের লালচে বা কালচে দাগ পড়ে যায়। রাতে কয়েক টুকরা লেবু কেটে বোতলে কিছু পানির সাথে ভিজিয়ে রেখে সকালে ভাল করে ঝাকিয়ে নিলে দাগ থাকবে না।

*           তৈজসপত্র পরিষ্কার করতে লেবুর রস খুবই উপকারী।

*           লেবু দিয়ে ম্যাজিক দেখানো হয়ে থাকে। যেমন- একটি ছুরিতে জবা ফুল ঘষে শুকাতে হবে। এই ছুরি দিয়ে লেবু কাঠলে লাল রক্তের মত রস ঝরতে থাকে।

*          গোপন পত্র লেখতেও লেবুর রসকে কালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। লেবুর রস দিয়ে পত্র লেখার পর শুকিয়ে গেলে তা আর পড়া যায় না। এই পত্রটি পানিতে ভিজালে লেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

*           লেবুর সুগন্ধ সকলের কাছেই প্রিয় বিধায় বিভিন্ন প্রসাধনী, ওয়াশিং পাউডার, সাবান, এয়ার ফ্রেশনার ইত্যাদিতে লেবুর গন্ধ ব্যবহার করা হয়।

 

————————————–

লেখকঃ

কেয়া ফার্মেসী, কলেজ মোড়, কোটপাড়া, কুষ্টিয়া। মোবাইল- ০১৭১২২৩৩০০৬।

সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহী।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

One Comment on “লেবুর যত গুণ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *