শীতকালীন সবজির যত গুন

আবু রিহান

শাক সবজি পুষ্টির অন্যতম আঁধার। অপুষ্টির প্রধান কারণ অপর্যাপ্ত সবজি গ্রহণ। পরিমিত পরিমাণ সবজি গ্রহণ না করলে শরীরে পুষ্টি উপাদান যেমন বিটা ক্যারোটিন গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। এফএও (ঋঅঙ) এর তথ্য অনুসারে প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ২০০ গ্রাম সবজি প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ ও মহিলার খাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে মাথাপিছু সবজি খাওয়ার হার মাত্র ৫৫ গ্রাম। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষের শরীরে পরিমিত মাত্রায় বিভিন্ন ধরণের পুষ্টি উপাদান যার মধ্যে ভিটামিন : ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-কে এবং খনিজ লবণ: ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ফসফরাস থাকা প্রয়োজন। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের সবজি গ্রহণের মাধ্যমে এর চাহিদা মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশে যত প্রকার সবজি জন্মে তার সিংহভাগ সবজি শীত কালে জন্মে। এবার জেনে নেওয়া যাক শীতকালীন সবজির গুনাগুন।

টমেটো

 

পুষ্টিগুনঃ শীত কালে যে সব সবজি বেশি পাওয়া যায় তার মধ্যে টমেটো অন্যতম। টমেটো সবজি হিসাবে আমরা খাই। কাঁচা টমেটো সালাদ আর রান্না করে তরকারি। প্রতি ১০০ গ্রাম টমেটোতে আছে: ভিটামিন এ ১০০০ আই ইউ, ভিটামিন-সি ২৩ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১১ মিলিগ্রাম, লৌহ ০.৬ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ২৭ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৩৬০ মিলিগ্রাম, এবং প্রোটিন ১ গ্রাম। আছে নিকোটিনিক এসিড ও প্রচুর গ্লুটামিক এসিড (৮৬-১৪০ গ্রাম)। একশো গ্রাম টমেটো থেকে শক্তি পাওয়া যায় প্রায় ২০ ক্যালরি। টমেটোতে পানির পরিমাণ প্রায় ৯৪ শতাংশ।

উপকারিতাঃ টমেটো শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এর ভিটামিন-এ ত্বককে সুন্দর রাখে। ভিটামিন সি স্কার্ভি প্রতিরোধ করে। ভিটামিন কে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। নিকোটিনিক এসিড রক্তের কোলেস্টরেল কমায়, তাই হৃদরোগ প্রতিরোধে টমেটো সহায়ক। গ্লুটামিক এসিড মস্তিস্ককে সুস্থ রাখে। টমেটোর পটাশিয়াম স্ট্রোক প্রতিরোধে কার্যকরী। ‘লাইকোপিন’ নামক এক ধরনের শক্তিশালী এন্টি অক্সিডেন্টের উপস্থিতির কারণে টমেটোর রং লাল। টমেটোর ন্যায় এত অধিক লাইকোপিন আর কোন ফল বা সবজিতে নাই। লাইকোপিন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। জরায়ুর মুখ, প্রষ্টেট, বৃহদন্ত্র, মলাশয়, পাকস্থলি, গ্রাসনালী, ইত্যাদি অংঙ্গের ক্যান্সার প্রতিরোধে টমেটো সহায়ক বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ। লাইকোপিন শরীরে তৈরি হয়না, তাই বাইরে থেকে এর সরবরাহ প্রয়োজন। রান্নায় লাইকোপিন নষ্ট হয়না, বরং বাড়ে। তাই টমেটো তরকারীতে দিয়ে রান্না করে খাওয়ায়ও বাড়তি উপকার। দৈনিক  তিন থেকে চারটি টমেটো খেলে এসব উপকার পাওয়া যাবে।

লাউ

শীতকালে আমাদের দেশে লাউ বেশ পাওয়া যায়। ব্যাপক জনপ্রিয় ও সুস্বাদু সবজি লাউ। গ্রামে কিংবাশহরে সকল মানুষের কাছে পরিচিত এই সবজি। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এ সবজি অত্যন্ত পুষ্টিকর। এসব কারণে লাউ আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। লাউ এর জন্ম ইতিহাস থেকে জানা যায়, এর আদি নিবাস আফ্রিকা। পরে তা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। লাউ একটি লতানো জাতীয় উদ্ভিদ।

লাউয়ের পুষ্টিগুনঃ লাউ এ ভিটামিন বি, সি শর্করা ও খাদ্য শক্তি পাওয়া যায়। পাতায় এ সি ক্যালসিয়াম প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। বীজে থাকে ৪৫% ফ্যাট এসিড, প্রোটিন, অ্যামাইনোএসিড ইত্যাদি। বীজের তেল মাথাব্যথা দূর করে এবং লাউ রান্নায় সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী লাউ গাছের পাতায় খাদ্য উপাদান হলো :প্রোটিন ২.৩ গ্রাম, শর্করা ৬.১ গ্রাম, চর্বি ০.৭ গ্রাম, ক্যালসিয়াম, ৮০গ্রাম, ক্যারোটিন ১৮৭ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন সি ৯০ মিলিগ্রাম, খাদ্য শক্তি ৩৯ কিলোক্যালরি। ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী লাউ এ খাদ্য উপাদান হলো : জলীয় অংশ ৮৩.১ গ্রাম প্রোটিন ১.১ গ্রাম শর্করা ১৫.১ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৬ গ্রাম, লৌহ ০.৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪ মিলিগ্রাম, খাদ্যশক্তি ৬৬ কিলোক্যালরি, খনিজ, পদার্থ ০.৫ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ২.৫ গ্রাম, ফসফরাস ১০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ১০.০৩ মিলিগ্রাম, বি ২.০১ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন ০.০২ মিলিগ্রাম তাছাড়া ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, ওমেগা ৬, ফ্যাটি এসিড আছে।

উপকারিতাঃ লাউ এর নানা ওষুধি গুণাগুণও রয়েছে। যারা কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে ভুগেন তারা নিয়মিত লাউ খেলে উপকার পাবেন। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলারা প্রায়ই কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে আক্রান্ত হন। তারা লাউ খেয়ে উপকার পেতে পারেন। এক্ষেত্রে লাউ শাক খুবই উপকারী। যাদের খাবার কম হজম হয় বা অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে তাদের জন্য লাউ খুবই উপকারি সবজি। নিয়মিত খেলে কর্ম শক্তি বাড়ে। যাদের শরীর গরম, বা মাথা গরম থাকে তারা লাউ খান উপকার পাবেন। যারা হৃদরোগে আক্রান্ত তারা নিয়মিত লাউ খান উপকার পাবেন। লাউ খেলে শরীরের চামড়ার আর্দ্রতা বজায় থাকে। ফলে শীতকালে চামড়ার টান টান ভাব কমে যায়। যারা হাই-প্রেসারে ভুগেন তারা নিয়মিত লাউ খান উপকার পাবেন। কানের ব্যথা লাউ গাছের নরম ডগার রস দিলে উপকার পাওয়া যায়। লাউ গাছের পাতার রসের সাথে চিনি মিশিয়ে খেলে জন্ডিস রোগে উপকার হয়। রাতে যাদের ঘুম কম হয় তারা রাঁতের খাবারে লাউ রাখলে উপকার পেতে পারেন। যাদের সব সময় মাথা গরম থাকে তারা লাউ-এর বীজ বেটে মাথার তালুতে দিলে উপকার পাবেন। শরীরে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেড়ে গেল। বা জ্বর হলে লাউ এর শাস নরম করে কপালে কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখলে খুবই উপকার পাওয়া যায়। তাপ শোষিত হয়ে যায়। খাওয়া অরুচি দেখা দিলে লাউ এর সবজি বা লাউ-এর বাকলের ভাজি খান সমস্যা কমে যাবে। এত উপকারী লাউ গাছ বাড়ির আশপাশে লাগান যতœ নিন। পরিবারের তরকারি সমস্যা সমাধান হবে। সকলের পুষ্টি চাহিদাও পূরণ হবে।

বাধাকপি

বাধাকপি একটি সুস্বাদু শীতকালীন সবজি। আমাদের দেশের ঘরে ঘরে একটি জনপ্রিয় খাবার এই বাধাকপি। এটি কাঁচা এবং রান্না দুইভাবেই খাওয়া যায়। স্বাদে ও গুণে অতুলনীয় এই সবজিটি বিশেষ পদ্ধতিতে চাষ করার কারণে মোটামুটি সারা বছরই পাওয়া যায়। তবে শীতকালীন বাধাকপির স্বাদ তুলনামূলক ভাবে অন্য সময়ের চাইতে বেশি। শুধু স্বাদই নয় বাধাকপির রয়েছে রোগ প্রতিরোধ ওজন কমানোর মত গুরুত্বপূর্ণ সব উপাদান।

বাধাকপির পুষ্টিগুনঃ পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম বাধাকপিতে রয়েছে ১.৩ গ্রাম প্রোটিন, ৪.৭ গ্রাম শর্করা, ০.০৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি১, ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি২ ও ৬০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। তাছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম বাধাকপিতে ৩১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৮ মিলিগ্রাম লৌহ, ৬০০ মাক্রোগ্রাম ক্যারোটিন ও ২৬ কিলো ক্যালোরী খাদ্যশক্তি থাকে। আসুন জেনে নেয়া যাক কোন ৬টি কারণে বাঁধাকপি খাওয়া উচিত।

উপকারিতাঃ নিয়মিত বাধাকপি খেলে আপনার আর মাল্টি ভিটামিন খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। কারণ বাধাকপিতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব ভিটামিনই আছে। বাধাকপিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও কে আছে। ভিটামিন সি হাড়ের বিভিন্ন সমস্যা দূর করে। এছাড়াও বাধাকপিতে উপস্থিত ভিটামিন কে হারকে মজবুত রাখে। যারা নিয়মিত বাধাকপি খায় তারা বয়স জনিত হাড়ের সমস্যা থেকে রক্ষা পায়। বাধাকপিতে খুবই সামান্য কোলেস্টেরল ও সম্পৃক্ত চর্বি আছে। এছাড়াও বাধাকপিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার আছে। ওজন কমাতে নিয়মিত সালাদে বাধাকপি খাওয়ার বিকল্প নেই। ওজন কমাতে চাইলে নিয়মিত খাবার তালিকায় প্রচুর পরিমাণে বাধাকপি রাখা ভাল। পাকস্থলির আলসারও পেপটিক আলসার প্রতিরোধে বাধাকপির জুড়ি নেই। বাধাকপি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। ত্বক ভালো রাখতে বাধাকপি ভাল কাজ করে। এর কাঁচাপাতা যদি রোজ ৫০ গ্রাম করে খেলে পায়রিয়া এবং দাঁতের অন্য কোন সমস্যা থাকবে না। প্রতিদিন বাঁধাকপির পাতা ৫০ গ্রাম খেলে আপনার মাথায় চুল গজাবে বাধাকপির রস খেলে ঘা সেরে যায়।

ফুলকপি

ফুলকপি, আমাদের অতি পরিচিত শীতকালীন একটি সবজি। পাতা দিয়ে ঘিরে থাকা অংশটি ফুলের মত বলেই এর নাম ফুলকপি। ফুলকপির ফুল অর্থাৎ সাদা অংশটুকু বেশি খাওয়া হলেও এর চারপাশের ঘিরে থাকা ডাটা ও পাতা দিয়ে তৈরি হয় সব্জি ভাজি ও স্যুপের মতই খাবার।

ফুলকপির পুষ্টিগুনঃ একটি মাঝারি আকারের ফুলকপিতে রয়েছে শক্তি-২৫ কিলোক্যালরি, কার্বোহাইড্রেট- ৪.৯৭ গ্রাম, প্রোটিন- ১.৯২ গ্রাম, ফ্যাট- ০.২৮, আঁশ-২ গ্রাম, ফোলেট-.৫৭ মাইক্রোগ্রাম, নিয়াসিন-০.৫০ মাইক্রোগ্রাম, থায়ামিন-০.০৫, প্যানথানিক এসিড-০.৬৬৭ মাইকোগ্রাম। এছাড়াও রয়েছে থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, ভিটামিন সি, কে, পটাসিয়াম, সোডিয়াম ইত্যাদি।

উপকারিতাঃ ফুলকপির রয়েছে অজ¯্র গুনাগুন। ফুলকপির গুনাগুনের কথা সর্বপ্রথম পাওয়া যায় ১২০০-১৩০০ শতকে আরব বিজ্ঞানী ইবনে আল আওয়াল এবং ইবনে আল বাইতির লেখায়। ফিগার সচেতনরা ফুলকপি খেতে পারেন নিঃশঙ্কায়। কারণ এতে ক্যালরির পরিমাণ অনেক কম। ক্যান্সার প্রতিষেধক হিসেবে ফুলকপি খেতে পারেন। ফুলকপি ক্যান্সার সেল বা কোষকে ধ্বংস করে। এ ছাড়া মূত্রথলি ও প্রোস্টেট, স্তন ও ডিম্বাশয় ক্যান্সার প্রতিরোধে ফুলকপির ভূমিকা অপরিসীম। ফুলকপিতে থাকা ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’ শীতকালীন বিভিন্ন রোগ যেমন জ্বর, কাশি, সর্দি ও টনসিল প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। ফুলকপির ভিটামিন ‘এ’ চোখের জন্যও প্রয়োজনীয়। উচ্চ রক্তচাপ, হাই কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিক রোগীরা ফুলকপি খেতে পারেন নিঃসঙ্কোচে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং কোলেস্টেরল কমাতেও ফুলকপি ভালো কাজ করে। ফুলকপিতে থাকা প্রচুর পরিমাণে আঁশ কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। তবে অবশ্যই কিছু কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। যেমন, যাঁরা কিডনির সমস্যায় ভুগছেন তাঁদের ফুলকপি বেশি না খাওয়াই ভালো।

বেগুন

বেগুন আমদের দেশের একটি অতিপরিচিত সবজি। বেগুনের পুষ্টিগুণ আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। যুগ যুগ ধরে বেগুন ব্যবহার হয়ে আসছে আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে। নামে বেগুন, কিন্তু আসলে গুণের।

বেগুনের পুষ্টিগুণ: আমাদের দেশে অনেক প্রজাতির বেগুন পাওয়া যায়। সব ধরণের বেগুনের পুষ্টিগুণ প্রায় একই। বেগুনে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, খনিজ, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-সি, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম প্রোটিন, খনিজ পদার্থ ম্যাঙ্গানিজ এবং থায়ামাইন আছে। বেগুন রক্তে কলেস্টেরল কমায়, পরিপাক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে এবং করোনারিহার্ট রোগ প্রতিরোধ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

উপকারিতাঃ বেগুনে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধক উপাদান। বেগুন পাকস্থলী, কোলন, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদ্রান্ত্রের ক্যানসারকে প্রতিরোধ করে। বেগুনে কোন কোলেস্টেরল নেই। যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি, তাদের জন্য বেগুন আদর্শ খাদ্য। কারণ, বেগুন ক্ষতিকর কোলেস্টেরল দূর করতে সহায়তা করে। বেগুনে আছে প্রচুর পরিমাণ আয়রন। আয়রন শরীরে রক্ত বাড়াতে সহায়তা করে। রক্ত শূন্যতার রোগীরা খেতে পারেন এই সবজি। বেগুনে আছে রিবোফ্ল্যাভিন। রিবোফ্ল্যাভিন মুখ ও ঠোঁটের কোণের ঘা, জিহ্বার ঘা প্রতিরোধ করে। জ্বর হওয়ার পর মুখের বিস্বাদও দূর করে বেগুন। তাই জ্বরের পর বেগুনের তরকারি খেলে মুখের স্বাদ ফিরে পাওয়া যেতে পারে। বেগুন ক্ষত স্থান দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। বেগুনে আছে প্রচুর পরিমান ভিটামিন ‘ই’ এবং ‘কে’। এরা শরীরের ভেতর রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। ফলে রক্ত চলাচল কার্যক্রমকে সচল রাখে। বেগুনের ভিটামিন ‘এ’ চোখের জন্য খুব উপকারী। এটি চোখের যাবতীয় রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। বেগুনে আছে প্রচুর পরিমাণ ডায়াটারি ফাইবার বা আঁশ। যা খাবার হজমে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বেগুনে আছে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম। এই দুই উপাদান দাঁত, হাড় ও নখের জন্য খুব উপকারী। ডায়রিয়া হলে শরীরে প্রচুর জিঙ্কের ঘাটতি দেখা দেয়। বেগুন জিঙ্কের ঘাটতি দূর করে। তবে ডায়রিয়া চলাকালিন সময়ে বেগুন খাওয়া ঠিক না। ডায়রিয়া ভালো হলে বেগুন খাওয়া উচিত।

মূলা

মূলা সব্জীটির নাম শুনলেই আমরা অনেকেই নাক কুঁচকে ফেলি। এটা যে খাবারযোগ্য একটি সব্জী হতে পারে তা আমাদের অনেকেরই কল্পনার বাইরে। কিন্তু এত ফেলে দেয়ার মত সবজি মূলা নয়। জাপানীদের অন্যতম প্রধান একটি খাবার মূলা।

মূলার পুষ্টিগুনঃ ১০০ গ্রাম কাচা মূলায় পুষ্টিমান রয়েছে ক্যালোরি ১৬, পানি ৯৫.৩ গ্রাম, প্রোটিন ০.৭ গ্রাম, শর্করা ৩.৫ গ্রাম, চর্বির পরিমান ০.১ গ্রাম, চিনি ১.৯ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৫.০ মিঃগ্রাম, লোহা ০.৩ মিঃগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১০ মিঃগ্রাম পটাশিয়াম ২৩৩ মিঃগ্রাম, ভিটামিন এ ৭.০ ইউনি, ভিটামিন সি ১৪.৮ মিঃগ্রাম, ভিটামিন কে ১.৩ মাইক্রোগ্রাম। জিঙ্ক ০.৩ মিলিগ্রাম, ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড ৩১.০ মিলিগ্রাম, ওমেগা ৬ ফ্যাটি এসিড ১৭.০ মিলিগ্রাম।

উপকারিতাঃ রক্তের দুষণ পরিস্কার করায় বিশাল এবং সেই সাথে শক্তিশালী এক ক্ষমতা রয়েছে মূলায়। যা আমাদের লিভার এবং পাকস্থলীর সমস্ত দুষণ এবং বর্জ্য পরিস্কার করে থাকে। এছাড়াও মূলা জন্ডিসের অন্যতম কারন বিলিরুবিনের পরিমান কমিয়ে আনে যা জন্ডিসের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এমনকি মূলা রক্ত কনিকায় অক্সিজেন সরবরাহের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলে, ফলে জন্ডিস রোগটি যে আমাদের শরীরের রক্ত কনাগুলো ভেঙ্গে ফেলে তার পরিমাণ কমিয়ে আনে। আঁশ সমৃদ্ধ সব্জী মূলা অত্যন্ত সাফল্যের সাথে অর্শ মোকাবেলা করে থাকে। মূলা কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর করে শরীরের মেটাবলিজমে সাহায্য করে ওজন কমায়। মুলা ওরাল, পাকস্থলী, বৃহদন্ত, কিডনী এবং কোলন ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত উপকারী। ক্যান্সারের সেল নির্মুলেও এর অবদান রয়েছে। শ্বেত রোগের চিকিৎসায় মূলা অত্যন্ত কার্যকরী। প্রচুর পরিমান খনিজ এবং ভিটামিনে পূর্ন মূলা স্কিনের বিভিন্ন সমস্যায় অত্যন্ত উপকারী। বিভিন্ন ক্ষত সারানো ছাড়াও কাচা মূলা ফেস প্যাক এবং ক্লিন্সার হিসেবেও দারুন উপকারী। মৌমাছির হুল অথবা যে কোন পোকা মাকড়ের কামড় দিলে মূলার রস লাগিয়ে দিলে সাথে সাথেই ফোলা এবং ব্যথা কমে যাবে। জ্বর এবং এর কারনে শরীর ফুলে যাওয়া কমাতে সাহায্য করে অত্যন্ত উপকারী সব্জী মূলা। কিডনীর অকার্যকরতায় মূলা অত্যন্ত উপকারী। মূলার প্রচুর পানি কিডনীর ভেতরে জমে থাকা নানা দূষনকে দূর করে কিডনীকে সুস্থ করে তোলে। মূলা এলার্জি, ইনফেকশন, ঠান্ডা লাগা ইত্যাদি রোগ নির্মুল করা ছাড়াও বিভিন্ন সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। লিভার এবং গলব্লাডার চিকিৎসায় মূলা অত্যন্ত কার্যকরী। মূলা বিলিরুবিন, পিত্তরস, এনজাইমস, এবং এসিড উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রন করে থাকে। এছাড়াও নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ, ক্ষুধা বৃদ্ধি, হুপিং কফ, গলায় ক্ষত, এসিডিটি, বমিভাব, মুত্রনালীর প্রদাহ এবং মাথা ব্যাথার জন্য অত্যন্ত উপকারী। কাঁচা মূলা আলসার এবং বিভিন্ন সংক্রমন থেকেও রক্ষা করে।

কাঁচা মরিচ

প্রতিদিন যাদের ভাতের সাথে একটি কাঁচা মরিচ না খেলে চলেই না তাদের জন্য সুখবর হচ্ছে কাঁচা মরিচ স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। মরিচকে ঝাল বানায় এর বিশেষ উপাদান ক্যাপসাইকিন।

পুষ্টিগুনঃ কাঁচা মরিচ সাধারণত কাঁচা, রান্না কিংবা বিভিন্ন ভাজিতে দিয়ে খাওয়া হয়। এতে আছে ভিটামিন এ, সি, বি-৬, আয়রন, পটাশিয়াম এবং খুবই সামান্য পরিমাণে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট। ঝাল স্বাদের সব্জিগুলোতে থাকে বিটা ক্যারোটিন ও আলফা ক্যারোটিন, বিটা ক্রিপ্টোক্সানথিন ও লুটেইন জিয়াক্সানথিন ইত্যাদি উপাদান।

উপকারিতা: গরম কালে কাঁচা মরিচ খেলে ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা থাকে। প্রতিদিন একটি করে কাঁচা মরিচ খেলে রক্ত জমাট বাধার ঝুঁকি কমে যায়। নিয়মিত কাঁচা মরিচ খেলে হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন সমস্যা কমে যায়। কাঁচা মরিচ মেটাবলিসম বাড়িয়ে ক্যালোরি পোড়াতে সহায়তা করে। কাঁচা মরিচে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিটা ক্যারোটিন আছে যা কার্ডোভাস্ক্যুলার সিস্টেম কে কর্মক্ষম রাখে। নিয়মিত কাঁচা মরিচ খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। কাঁচা মরিচ রক্তের কোলেস্টেরল কমায়। কাঁচা মরিচে আছে ভিটামিন এ যা হাড়, দাঁত ও মিউকাস মেমব্রেনকে ভালো রাখতে সহায়তা করে। কাঁচা মরিচে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি আছে যা মাড়ি ও চুলের সুরক্ষা করে। নিয়মিত কাঁচা মরিচ খেলে নার্ভের বিভিন্ন সমস্যা কমে। প্রতিদিন খাবার তালিকায় অন্তত একটি করে কাঁচা মরিচ রাখলে ত্বকে সহজে বলিরেখা পড়ে না। কাঁচা মরিচে আছে ভিটামিন সি। তাই যে কোনো ধরণের কাটা-ছেড়া কিংবা ঘা শুকানোর জন্য কাঁচা মরিচ খুবই উপকারী। কাঁচা মরিচের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি শরীরকে জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি থেকে রক্ষা করে।

পরিশেষে, এ দেশে প্রায় দেড় কোটি বসতবাড়ি আছে। রিপোর্ট অনুসারে মোট বসতবাড়ির মাত্র ১৩ ভাগ বাড়ি সবজি চাষের আওতাভুক্ত। ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিরাই বেশি অপুষ্টিতে ভোগে। ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিদের কোনো সবজি বাগান নেই বা খুব অল্প পরিমাণে আছে। লাখ লাখ শিশু ও মহিলা এক বা একের অধিক অপুষ্টিতে ভুগছে। তার মধ্যে জন্মানোর সময় শিশুর কম ওজন, খাটো হয়ে যাওয়া, ভিটামিন-এ এর অভাব, আয়োডিনের অভাবজনিত বিকলাঙ্গতা এবং এনিমিয়া অন্যতম। এসব ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিদের বসত বাড়ির আশে পাশে সবজি চাষের আওতায় আনতে হবে। যেহেতু শীতকালে প্রচুর পরিমাণে সবজি উৎপাদিত হয় সে কারনে এসব সবজি বেশি পরিমাণে খাওয়া উচিত। তাহলে দেশ পাবে সুস্থ ও সমৃদ্ধ এক জাতি।

 

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *