শুধু খাদ্য নয় প্রয়োজন পুষ্টি নিরাপত্তা

নিতাই চন্দ্র রায়

ডিম ও মুরগির মাংসের দাম কমে যাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক পোল্ট্রি খামার। পোল্ট্রি খামারগুলি ধ্বংসের পর এখন আবার বিদেশ থেকে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি করে অতি কষ্টে গড়ে তোলা পশুখামারগুলি ধ্বংসের পায়তারা করছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ মাংস উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও দেশে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি করা হয়। এসব মাংসের আমাদানিতে কেজি প্রতি দাম  পরে ১০৮ থেকে ২২৫ টাকা। এই দাম দেশে উৎপাদিত মাংসের চেয়ে অনেক কম। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বাজারে প্রতিকেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ টাকায় এবং রাজধানীর বাইরের বাজারগুলিতে বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা কেজি দামে।

হিমায়িত গরুর মাংস আমদানির এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে  বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের  প্রতিবেদন থেকে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গরুর মাংস আমদানির বিষয়ে মতামত চেয়ে ট্যারিফ কমিশনের কাছে প্রতিবেদন চাইলে কমিশন তা তৈরি করে  মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। ট্যারিফ কমিশন গরুর মাংস আমদানির বিষয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছে। এসব মতামতে বলা হয়-দেশে গরুর খামারের সংখ্যা বাড়ছে এবং মাংসের উৎপাদন এখন চাহিদার চেয়ে বেশি হচ্ছে। তাই বিদেশ থেকে হিমায়িত মাংস আমদানি হলে ভবিষ্যতে মাংসের দাম কমে যাবে এবং খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায়, দেশের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ভারত থেকে হিমায়িত মাংস আমদানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি চেয়েছে। কিছুদিন আগে ভারতের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে মাংস রপ্তানির প্রস্তাব দিয়ে গেছে। গত ২৮ নভেম্বর এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মতামত চাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ট্যারিফ কমিশন এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়-বর্তমানে দেশের শিক্ষিত বেকার যুবকেরা গরু পালন ও গরু মোটা তাজাকরণ কাজে নিযুক্ত রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে  গরু কেনা, গরু লালন-পালন, গরুর সংকরায়ণ, দুগ্ধজাতীয় খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন ও বিপণন খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে। দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে গবাদিপশু পালনে ব্যাপক বিনিয়োগ হচ্ছে। এ কারণে ভবিষ্যতে গরুর মাংসের দাম কমে যাবে বলে অনুমিত হয়। কমিশনের ধারণা, হিমায়িত মাংস আমদানি বাড়লে এসব খামারির ক্ষতি হবে। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ আদায় কঠিন হয়ে  দাঁড়াবে।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার  জঙ্গলবাড়ি গ্রামের বুলবুল মাষ্টার গত বছর একটি গরুর খামার গড়ে তুলেন। তার  খামারে ১২ টি গরু আছে এবং বিনিয়োগ হয়েছে প্রায়  ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা । খামার মালিক বুলবুল মাষ্টার এ বিষয়ে বলেন,‘দেশে এখন প্রচুর গরুর খামার গড়ে উঠেছে। মাংস আমদানি হলে এসব খামারের মালিকেরা সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে।’ ত্রিশাল পৌরসভার মাংস ব্যবসায়ী মোঃ শাহীন মিয়াও একই কথা বলেন। দেশে এক কেজি দানাদার খাবারের দাম ৪০ টাকা। এক কেজি গরুর মাংস উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ৩৫০ টাকা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মতে ১৯৭১-৭২ অর্থ বছরে দেশে মাংসের উৎপাদন ছিল  ৫ লাখ মেট্রিক টন বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে  ৭১ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টনে। দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদার আলোকে প্রাণিজ আমিষের  ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ৪৮ টি জেলার  ১২৫টি উপজেলায় আবহাওয়া উপযোগী সংকর জাতের বীফ ব্রীড উৎপাদনের উদ্দেশে ব্রাহমা জাতের হিমায়িত সিমেন আমদানি করে মাংসল জাতের  গরু উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একটি ব্রাহমা জাতের ষাড় থেকে এক হাজার কেজি মাংস পাওয়া যায়। এই মাংসল জাতের গরুর জাত সম্প্রসারণ কার্যক্রম সফল হলে দেশে গরুর মাংসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে এবং দামও সাধারণ ভোক্তাদের সামর্থের মধ্যে চলে আসবে।

ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে দেশে প্রায় ২০ টন গরুর মাংস আমদানি হয়েছে। আগের অর্থ বছরে দেশে ৫৫ মেট্রিক টন গরুর মাংস আমদানি হয়েছিল এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১৮ মেট্রিক টন গরুর মাংস। এসব মাংস এসেছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকে হিমায়িত অবস্থায়। গত বছর দেশে অস্ট্রেলিয়া থেকে ১৩ মেট্রিক টন গরুর মাংস আমদানি হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে আমদানি হয়েছে ৪ দশমিক ২ টন আর ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৯২০ কেজি। বাকিটা আমদানি হয়েছে অন্যান্য দেশ থেকে। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয় অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিকৃত প্রতিকেজি গরুর মাংসের দাম পড়েছে ২২৫ টাকা। মালয়েশিয়া থেকে আমদানিকৃত মাংসের গড় দাম পড়েছে ১০৮ টাকা আর ভারত থেকে আমদানিকৃত মাংসের গড় দাম পড়েছে ১২০ টাকা।

বাংলাদেশে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি নিষিদ্ধ নয়। আমদানি নীতি আদেশ ২০১৫-১৮ অনুযায়ী, দেশে শূকর ছাড়া অন্যান্য পশুর মাংস আমদানি করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে আমদানি করতে হয়। তবে আমদানির ক্ষেত্রে রয়েছে  নানা রকম শর্ত। শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো গরু, ছাগল ও মুরগীর মাংস এবং মানুষের খাওয়ার উপযোগী অন্যান্য পশুর মাংস আমদানির ক্ষেত্রে মোড়কের গায়ে রপ্তানিকারক দেশের উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ মুদ্রিত থাকতে হবে। মাংস নানা ধরণের ক্ষতিকর উপাদান, অ্যান্টিবায়োটিক ও রোগমুক্ত বলে সনদ থাকতে হবে। মাংস বন্দরে পরীক্ষা করবে বাংলাদেশি সরকারি সংস্থা।

গত কয়েক বছরে মাংসের দাম বৃদ্ধি এবং অল্প জমি থেকে অল্প সময়ে  অধিক লাভের কারণে তরুণদের মধ্যে পশু  খামার করার  প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশে গরু, ছাগল ও মহিষের উৎপাদন বাড়ছে। এ জন্য গরুর মাংসের দাম কিছুটা কমেছে। ঢাকার মাংস ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিকেজি মাংসের দাম ৫০০ টাকা থেকে কমে ৪৮০ টাকায় নেমেছে। ঢাকার বাইরে কোনো কোনো উপজেলা শহরে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৪৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। পশুসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে শিক্ষিত বেকার যুবকেরা এখন গবাদী পশুর খামার করছেন। গরু ও মাংস আমদানি না হলে মাংসের উৎপাদন ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে। তাই গরু ও গরুর মাংস আমদানি করা উচিত হবেনা। এটা হলে দেশের খামারগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে।

২০১৪ সালের মে মাসে ভারতে  বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু পাচার রোধে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ শুরু হয়। এর আগে ভারত  থেকে বছরে আনুমানিক ২০ লাখ গরু আসতো। ভারতীয় গরু আসা কমে যাওয়ার কারণে দেশে গরুর খামার গৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে যে ৫  কোটি ৪৭ লাখ ৪৫ হাজার গবাদি পশু ছিল, তার মধ্যে গরুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩৯ লাখ, মহিষ ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ছাগল ২ কোটি ৫৯ লাখ এবং ভেড়া ৩৪ লাখ। এ সংখ্যা প্রতি  বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কুষ্টিয়া ও পাবনার পৌরবাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই গরুর মাংসই কিছুদিন আগে ৪৫০ থেকে ৪৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

মানুষের দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার জন্য ২৫ শতাংশ নির্ভর করে জীনগত বৈশিষ্ট্য এবং ৭৫ শতাংশ নির্ভর করে  সুষম খাদ্য ও জীবনাচরণের ওপর। বিশ্বের ৩৯ টি দেশের মানুষের গড় আয়ু ৮০ বছরের ওপরে। জাপানের গড় আয়ু ৮৫ বছর, সিঙ্গাপুরের গড় আয়ু ৮৪.৯৫ বছর। প্রতিবেশি দেশ ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেশি।  ভারতের গড় আয়ু ৬৮.৪৫ বছর, নেপালের ৬৭.৮৬ বছর ও পাকিস্তানের গড় আয়ু ৬৭.৭৩ বছর। অপরদিকে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭১.২৩ বছর। ২০৫০ সালের মধ্যে জাপান তার দেশের মানুষের গড় আয়ু ৮৫ থেকে বাড়িয়ে ৯১.৫৮ এবং সিঙ্গাপুর ৯১.৫৫ বছরে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও তার মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। তা করতে হলে  খাদ্য তালিকায় পুষ্টিকর খাবার বিশেষ করে প্রাণিজ প্রোটিনের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে  মাথাপিছু প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ মাত্র ৬৬ গ্রাম, যার মধ্যে ২৫ শতাংশ আসে প্রাণিজ উৎস থেকে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু প্রোটিন ভোগের পরিমাণ ৮৩ গ্রাম, যার ৬৭ শতাংশ আসে প্রাণিজ উৎস থেকে। তাই শুধু প্রোটিন গ্রহণ করলেই চলবে না। প্রাণিজ উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ আরো বাড়াতে হবে। প্রতি বছর বাংলাদেশে অপুষ্টি জনিত জটিলতার কারণে ৫৩ হাজার শিশু মারা যায় এবং শতকরা ৪২ ভাগ কিশোরী অর্থনৈতিক অস্বচ্চলতার জন্য অপুষ্টিতে ভুগে। মাতৃত্বকালীন অপুষ্টির ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। তাই উন্নত দেশ ও জাতি গড়তে হলে আমাদেরকে শুধু খাদ্য নয়; পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে প্রাণিজ প্রোটিনের প্রয়োজনীয় ব্যবহার।এ জন্য দেশে গরু ,ছাগল, মহিষ, হাঁস, মুরগীসহ প্রাণিজ সম্পদের উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারের কৃষি ও খামার বান্ধব নীতির ফলে দেশে প্রাণিজসম্পদ উন্নয়নের যে নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র বিমোচনের যে সুযোগ সৃৃষ্টি হয়েছে, বিদেশ থেকে হিমায়িত মাংস আমদানির ফলে তা বিপর্যস্ত ও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করেন অভিজ্ঞমহল ।

———————————-লেখকঃ সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ, ৪৫/১ হিন্দু পল্লী , ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

ইমেইল: netairoy18@yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare