সজনে ডাঁটার নানা পুষ্টিগুণ

উম্মে নুসাইবা

আমাদের দেশের প্রায় সর্বত্র এখন সজনা পাওয়া যায়। অনেকেই সজনে ডাঁটা খেতে পছন্দ করেন। এটা এমন এক ধরণের সবজি যা ভেষজ ও পুষ্টিগুণে ভরপুর। সজনে ডাঁটার ফুল, পাতা ও ডাঁটা সবটাই খাওয়া যায় এবং সবকিছুতেই রয়েছে সমান ভেষজ ও পুষ্টিগুণ। সজনে গাছ আম ও কাঁঠাল গাছের মতো বড়  হয়। তবে এটি তুলানামূলক নরম প্রকৃতির। পাতাগুলো ছোট ছোট। মজার ব্যাপার হলো-যখন সজনে হয় তখন গাছে কোনো পাতা থাকে না, পাতাবিহীন গাছে ঝুলে থাকা সজনে ডাঁটা দেখতে বেশ ভালো লাগে। গরমকালে আমাদের বিভিন্ন রোগবালাই থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করে সজনে ডাঁটা। বিশেষ করে জলবসন্ত, ডায়রিয়া ও লিভারজনিত রোগ প্রতিরোধে এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের চাহিদা পূরণে আমলকি, কমলা, মাছ, মাংস, টমেটো, গাজর, পেঁপে, ইত্যাদি খাবারের ওপর আমরা নির্ভর করে থাকি। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, সুষম খাবারের প্রত্যেকটি উপাদানই সজনে ডাঁটা ও এর পাতায় যথেষ্ট পরিমাণেই রয়েছে।

পুষ্টিবিজ্ঞানীরা এই সজনে ডাঁটার নাম দিয়েছেন ‘পুষ্টির ডিনামাইট’। কারণ মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয  প্রায়  সব ধরণের খাদ্য উপাদান এতে উপস্থিত রয়েছে। বাংলাদেশে সজনে নিয়ে তেমন একটা গবেষণা না হলেও বহির্বিশ্বে এ নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায়  জানা গেছে, সজনেতে রয়েছে মানুষের প্রয়োজনীয়  প্রায়  সব অ্যামাইনো অ্যাসিড। ভারতীয  আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে সজনে প্রায়  ৩০০ রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে বহু গুণের আধার এই সজনে ডাঁটা।

সজনের আদি নিবাস ভারতের পন্ডিমাঞ্চলে ও পাকিস্তানে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমারে প্রচুর পরিমাণে সজনে ডাঁটা জন্মে। সজনে প্রাকৃতিক ভাবে জন্মে, আবার চাষও করা যায় । পান্ডাত্যে এর কদর রয়েছে বলে সেখানেও কিছু কিছু সজনে চাষ হয় । সজনে গাছ খুব সহজেই কলম করা যায়। আবার ডাল ভেঙ্গে লাগালেও গাছ হয় ।

সজনে ডাঁটা নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর। খাদ্যযোগ্য প্রতি ১০০ গ্রাম সজনে ডাঁটায় রয়েছে –

জলীয়  অংশ ৮৩.৩ গ্রাম

খনিজ ১.৯ গ্রাম

আঁশ ৪.৮ গ্রাম

খাদ্যশক্তি ৬০ কিলোক্যালরি

প্রোটিন ৩.২ গ্রাম

চর্বি ০.১ গ্রাম

শর্করা ১১.৪ গ্রাম

ক্যালসিয়াম ২১.০ মিলিগ্রাম

লৌহ ৫.৩ মিলিগ্রাম

ক্যারোটিন ৭৫০ মাইক্রোগ্রাম

ভিটামিন বি১ ০.০৪ মিলিগ্রাম

ভিটামিন সি ৪৫.০ মিলিগ্রাম

নানা খাদ্য উপাদানের পাশাপাশি সজনের রয়েছে অনেক ভেষজ গুণ। শুধু ডাঁটা নয়  সজনে গাছের অন্যান্য অংশেরও রয়েছে নানা গুণাগুণ। যেমন –

*          সজনের পাতা শাকের মতো রান্না করে খাওয়া যায়। এতে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়  ও খাবারে রুচি আসে। পেটের অসুখে সজনে পাতার ঝোল রান্না করে খেলে উপকার পাওয়া যায়।

*          সজনে ডাঁটার মতো পাতাতেও রয়েছে ভিটামিন এ, বি, সি, প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেটসহ শরীরের প্রয়োজনীড  আরো উপাদান।

*          সজনে ফুলও শাকের মতো রান্না করে খাওয়া যায় । ফুল দিয়ে বড়া বানিয়েও খাওয়া যায়। সজনের ফুল বসন্ত রোগের প্রতিষেধক।

*          সর্দি-কাশি, প্লীহা, যকৃতের কার্যকারিতা কমে গেলে, ক্রিমি ইত্যাদি সমস্যায়  সজনের শুষ্ক ফুল টনিক হিসেবে কাজ করে।

*          সজনের ফুল বাত ও শিরোরোগ উপশম করে।

*          পাকা পাতার রস ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

*          ফোঁড়া বা আঘাতজনিত ব্যথা ও ফোলায়  সজনের পাতা বেটে অল্প গরম করে লাগালে উপশম হয় ।

*          অনবরত হিক্কা বা হেঁচকি হতে থাকলে সজনে পাতার ২/৩ ফোঁটা রস দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে তা সেরে যায়।

*          কানের ব্যথা সারাতে সজনের বীজের তেল খুব উপকারী।

*          চোখের নানা সমস্যা যেমন ব্যথা, পানি বা পিচুটি পড়া সারাতে পাতা সেদ্ধ পানি দিয়ে চোখ ধুলে উপশম হয ।

*          দাঁতের মাড়ি  ফুলে গেলে পাতা থেঁতো করে মুখে পুরে রাখলে মাড়ির ফোলা কমে যায়।

*          দাঁতের ব্যথা হলেও সজনে গাছের আঠা দাঁতে লাগিয়ে রাখলে ব্যথা কমে যায় ।

*          সজনে ফুলের রস কোষ্ঠকাঠিন্য ও হাঁপানি প্রতিরোধে সহায়তা করে।

*          সজনে পাতার রস খুশকি দূর করতে সাহায্য করে।

*          শরীর ব্যথায  সজনে গাছের শেকড়  বেটে লাগালে ব্যথা উপশম হয় ।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *