সবজি ও ফলের নানা গুণ

রমজান মাসের অন্যতম প্রধান খাবার ছোলার ডাল বা ছোলা। উচ্চমাত্রার প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার ছোলা। কাঁচা, সেদ্ধ বা তরকারি রান্না করেও খাওয়া যায়। কাঁচা ছোলা ভিজিয়ে, খোসা ছাড়িয়ে, কাঁচা আদার সঙ্গে খেলে শরীরে একই সঙ্গে আমিষ ও অ্যান্টিবায়োটিক যাবে। আমিষ মানুষকে শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান বানায়। আর অ্যান্টিবায়োটিক যেকোনো অসুখের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ছোলায় রয়েছে জ্বর ভালো করার ক্ষমতা। আর কাঁচা ছোলার ক্ষমতা রান্না ছোলার চেয়েও বেশি। কারণ, পানিতে ভেজানো ছোলায় ভিটামিন-বি-এর পরিমাণ বেশি থাকে। ভিটামিন-বি বেরিবেরি রোগ, মস্তিষ্কের গোলযোগ, হ্রৎপিণ্ডের দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ছোলায় ভিটামিন-সিও রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। ঝাল, তেল, মসলা দিয়ে রান্না করা ছোলার চেয়ে কাঁচা ছোলার পুষ্টি বেশি। রান্না ছোলায় যত কম তেল, মসলা দেওয়া যায়, ততই ভালো। ছোলা কৃমিনাশক হিসেবেও কাজ করে। ভিনেগারে সারা রাত ছোলা ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে খেলে কৃমি মারা যায়।

যৌনশক্তি বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাসনালিতে জমে থাকা পুরোনো কাশি বা কফ ভালো হওয়ার জন্য কাজ করে শুকনা ছোলা ভাজা। ছোলা বা বুটের শাকও শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী। প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ রয়েছে এই ছোলায় ও ছোলার শাকে। ডায়াটারি ফাইবার খাবারে অবস্থিত পাতলা আঁশ, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। তাই শুধু রমজান মাস নয়, ১২ মাসেই ছোলা হোক আপনার সঙ্গী।

গ্রীষ্মকালীন ফল বাঙ্গি

গরমের মৌসুমের ফলগুলোর মধ্যে বাঙ্গি অন্যতম। ফলিক এসিডে ভরপুর এই ফল। ফলিক এসিড রক্ত তৈরিতে সাহায্যকরে। তাই মানুষের জন্য, বিশেষত গর্ভবতী মায়েদের জন্যবাঙ্গি যথেষ্ট উপকারী। এই ফলেনেই কোনো চর্বি বা কোলস্টেরল। তাই বাঙ্গি খেলেমুটিয়ে যাওয়ার ভয় নেই; বরং দেহের ওজন কমাতে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে এর ভূমিকা অপরিহার্য। এতে রয়েছে উচ্চ পরিমাণের ভিটামিন ‘সি’ এবং বিটা ক্যারোটিন। বিটা ক্যারোটিন ও ভিটামিন ‘সি’র সংমিশ্রণে শরীরের কাটা ছেঁড়া দ্রুত শুকায়। এতে চিনির পরিমাণ খুব অল্প। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও বাঙ্গি যথেষ্ট উপকারী। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আঁশ বা ডায়াটারি ফাইবার, যা খাবার হজমে সাহায্য করে। গরমের জন্য হয় সানবার্ন, সামার বয়েল, হিট হাইপার পাইরেক্সিয়া (অতিরিক্ত গরম বা রোদের তাপ লাগলে এই অসুখগুলো হয়)। বাঙ্গির রস এই অসুখগুলো দূর করে ত্বক ও শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখে। ফলে ত্বকের মসৃণতাও নষ্ট হয়না। এসিডিটি, আলসার, নিদ্রাহীনতা, ক্ষুধামন্দা, নারীদের হাড়ের ভংগুরতা রোধ করে বাঙ্গি। পুরুষের হাড়কেও করে মজবুত। মনের অবসাদ দূর করার ক্ষমতাও রয়েছে এই ফলে। নিদ্রাহীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঙ্গি। ত্বককে আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থেকে রক্ষা করে। দ্রুত পচে যায় বাঙ্গি। তাই দ্রুত খাওয়া উচিত। ফ্রিজে না রাখাই উত্তম।

বেগুনেরও গুণ আছে

বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়। আসলেও তাই। শুধু বৃক্ষের নাম বলে কথা নয়, ফলের নামেও কিছু যায়-আসে না। পুষ্টিগুণই হচ্ছে আসল ব্যাপার। বৃক্ষ ও ফলের নাম, উভয় দিকের বিবেচনায় বেগুনের কপাল মন্দই বলা যায়। নামই যার ‘বেগুন’, তার আবার গুণ কি? বেগুন নিয়ে এ রকম মন্তব্য করেন অনেকেই। কিন্তু আসলেই কি বেগুনের কোনো গুণ নেই? প্রকৃতপক্ষে বেগুনেরও গুণ আছে। হতে পারে সেই পুষ্টিগুণ অন্য তরিতরকারির তুলনায় কম। বেগুন যে একেবারেই কাজে আসে না তা কিন্তু নয়।

প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যেপযোগী বেগুনে রয়েছে ০.৮ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ১.৩ গ্রাম আঁশ, ৪২ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ১.৮ গ্রাম আমিষ, ২.২ গ্রাম শক্ররা, ২৮ মিগ্রা ক্যালসিয়াম, ০.৯ মিগ্রা লৌহ, ৮৫০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন (ভিটামিন-এ-এর প্রাক অবস্থা), ০.১২ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০৮ মিগ্রা ভিটামিট বি-২, ৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি ইত্যাদি। শিশুদের ক্ষেত্রে ভিটামিন-এ-এর চাহিদা ৩০০-৪০০ মাইক্রোগ্রাম। বয়স্কদের ক্ষেত্রে তা ৫৭৫-৭৫০ মাইক্রোগ্রাম। মাত্র ১০০ গ্রাম বেগুন থেকে সহজেই ভিটামিন-এ-এর সেই চাহিদা পূরণ করা যায়।

এছাড়া অন্যান্য সহায়ক পুষ্টি উপাদান তো রয়েছেই। অন্য তরিতরকারির তুলনায় বেগুনের দামও একটু কম। সেই বিচারে বেগুন কম দামে ভিটামিন-এ সরবরাহ করছে বলা যায়। তাছাড়া গ্রামগঞ্জে অধিকাংশ লোকই বেগুন পছন্দ করেন। কাজেই বেগুনের নামকে বিবেচনায় না রেখে পুষ্টিগুণের বিচারে বেগুন খাওয়াকে উৎসাহিত করা উচিত।

তবে বেগুনের একটি দুর্নাম হচ্ছে- এটি এ্যার্লাজির উদ্রেক করে। এ কথাটিও পুরোপুরি ঠিক নয় এ কারণে যে, যেকোনো খাবারের প্রতি যে কারও এ্যালার্জি থাকতে পারে। এক্ষেত্রে শুধু বেগুনকে দোষ দিয়ে লাভ কি? তবে বেশিরভাগ লোকজনই বেগুন খায় বলে হয়ত বেগুনের এ্যালার্জিটা একটু বেশি চোখে পড়ে। যেমন- সবাই পানি পান করি বলে অসাবধানবশত পানিবাহিত রোগই সমাজে বেশি দেখা যায়। তবে বেগুনের প্রতি এ্যালার্জি থাকলে বেগুন খাবেন না। অন্য কোন খাবারের প্রতি কারও এ্যালার্জি থাকলে সেক্ষেত্রেও এই পরিহার নীতি প্রয়োজন। কিন্তু এ্যালার্জি না থাকলে অকারণ ভয়ে বেগুন পরিহার করার যুক্তি নেই।

উম্মে নুসাইবা

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *