সব ঋতুতেই ফুল

ড.মোঃ শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া
ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ৷ এত স্পষ্ট ছয় ঋতুর পালা বদল পৃথিবীর আর কোন দেশে আছে কিনা জানা নেই৷ একেক ঋতুতে এদেশে একেক রকম পরিবেশ৷ এদেশের সোনাফলা মাটিতে তাই একেক ঋতুতে ফোটে একেক রকম ফুল৷ কোন কোন ফুল গাছ আবার ফুল ফুটিয়ে চলে একাধিক ঋতুতেও৷ খুব কড়াকড়ি ঋতুর সীমানা তারা মানতে নারাজ৷ রয়েছে এমন গাছও অর্ধবর্ষ জুড়ে যার ফুটতে থাকে ফুল৷ আবার ঋতুর তোয়াক্কা না করে সারা বছরই ফুল ফোটে তেমন ফুলের গাছও আমাদের রয়েছে৷
নতুন বছরের বারতা নিয়ে আসে বৈশাখ৷ কখনো গ্রীষ্মের দাবদাহকে উড়িয়ে দিতে আসে কাল বৈশাখী৷ সে ঝড় থামলে আদর্্র উষ্ণ পরিবেশে ঘুমটা ঠেলে বেড়িয়ে আসে কত ফুল৷ গ্রীষ্মকালের ফুল হলো জারুল, পারুল, হিজল, চামেলী, কনকচাঁপা, কৃষ্ণচূড়া, লাল সোনাইল, সোনাইল এসব৷ জারুলের ডালের শীর্ষে ঝুলে থাকে বড় বড় বেগুনি রঙের ফুলের থোকা৷ পারুলের ডালে ডালে তামাটে একক ফুল সুগন্ধ ছড়ায় চারপাশে৷ মালার মত ঝুলন্ত ডাঁটায় ছোট ছোট গোলাপী বা লাল ফুলে ভরে ওঠে হিজলের ডাল৷ চামেলীর সুগন্ধি সাদা ফুল মঞ্জুরীতে ফোটে থাকে ডালের শীর্ষে৷ সুগন্ধি কমলা রঙের ফুলের বাহার নামে কনকচাঁপার শাখায়িত মঞ্জুরীতে৷ কৃষ্ণচূড়া এ সময়ের এক অতি পরিচিত প্রিয় ফুল৷ বৃষ্টির শুরুতেই সারা গাছ ভরে ওঠে কমলা লাল ফুলে কৃষ্ণচূড়ার ডাল৷ লাল সোনাইলের ডাল জুড়ে সারিবদ্ধভাবে ফোটে থাকে গোলাপী রঙের অজস্র্র ফুল৷ কচি পাতার সাথে লম্বা লম্বা ঝুলন্ত ফুলের ছড়ায় ঝুলতে থাকে সোনাইল বা বান্দর লাঠির হলুদ হলুদ ফুল৷
গ্রীষ্মের ফুল জারুল
বর্ষা আসে রিমঝিম বৃষ্টির তালে৷ এ সময় প্রকৃতি প্রায়শই ঘন কালো মেঘে ঢেকে দেয় আকাশ৷ অত:পর অঝোর বৃষ্টি ঝরিয়ে দিয়ে চারপাশে আলোর মেলা ঢেলে দেয় প্রকৃতি৷ আলোর রেখায় চিক চিক করে ওঠে পানির কণা৷ অতি আর্দ্রতা আর বাড় বাড়তি তাপমাত্রার মিশেলে বর্ষায় ফোটে ওঠে কত রকম ফুল৷ বর্ষা এলোতো এলো ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’৷ আন্ডর্য রকমভাবে বিন্যস্ত পুষ্প মঞ্জুরীতে ভরে ওঠে কদমের গাছ৷ বর্ষার শুরুতেই আরো ফোটে সিদুঁরে লাল তারালতার ফুল৷ ভিজেমাটি পছন্দ বলে বর্ষায়ই দেখা দেয় দোলনচাঁপা৷ গাছের আগায় এদের ফোটে থাকে প্রজাপতি গড়নের সুগন্ধি সাদা ফুলের থোকা৷ বর্ষার আর্দ্রতায় সিক্ত হতে পছন্দ করে ডে-লিলি৷ বাংলায় এটি নাম পেয়েছে গুলনার্গিস৷ কান্ডের শীর্ষ দেশে এদের ঝুলে থাকে হলুদ বা কমলা বর্ণের গন্ধহীন ঘন্টাকৃতির ফুল৷ বর্ষার আর এক ফুল হলো সূখদর্শন৷ চ্যাপ্টা পুরু ডাঁটার আগায় বেগুনি ক্রমপ্রস্ফুটিত ফুল দেখতেই কত সুখ৷ মালতীলতা এ সময়ের আরেকটি ফুল৷ মঞ্জুরীতে এদের ফোটে থাকে সাদা সাদা সুগন্ধি ফুল৷ বর্ষার কিছু মরসুমী ফুলও রয়েছে৷ আর্দ্র-উষ্ণ পরিবেশে হুড়হুড়ি, মোরগ ফুল, বোতাম ফুল, অপরাজিতা, আইপোমিয়া, দোপাটি, কৃষ্ণকলি আর সন্ধ্যামণি এসব মরসুমী ফুলের বাহার বাগানে জাগিয়ে তুলে প্রাণের আর রঙের মেলা৷
mohdfiendblog_1220439573_9-kadam1111
বর্ষার ফুল কদম
শরতের আর এক রূপ বাংলার৷ ধবধবে নীল আকাশ৷ এর মাঝে নিঃসংকোচে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা৷ রাতের আকাশ বড় বেশি ঝলমলে৷ শরতের জ্যোত্‍স্নায় গ্রাম বাংলার পথ ঘাট বন জঙ্গল আর এক কমনীয় রূপ ধারণ করে৷ বুঝি সে আনন্দ ভাগ করে নিতে সন্ধ্যায় ফোটে শেফালী আর টুপটাপ ঝরে পরে হলুদ বোটার সাদা সাদা ফুল দিনের সূর্যকে আলিঙ্গন করার আগেই৷ শরতের সাদা মেঘের সাথে পাল্লা দিয়ে কাশবনে দোলে সাদা সাদা কাশফুল৷ নদীর পাড়ে দীর্ঘ কাশবনের দুলায়িত ফুল প্রাণের ভেতর সে এক অন্যরকম অনুভূতির বিস্তার ঘটায়৷ শরত্‍কালে বাগানে ফোটে কলাবতী, করবী, জবা, স্থলপদ্ম আর রাধাচূড়া৷ এ সময় বিলে ঝিলে ফোটে থাকে শাপলা, পদ্ম আর রক্তকমল৷
51e680e1eccc3-03
শরতের ফুল শিউলি/শেফালী
হেমন্ত কালে মাঠে মাঠে ধান কাটার ধূম৷ চারদিকে নতুন ধানের কেমন আবেশ করা গন্ধ৷ আকাশে ছিন্ন ভিন্ন মেঘের উপস্থিতি৷ ফুলের বনে তখনও শরতের আবেশ৷ এ সময় ফোটে ওঠে হাস্নাহেনা, মধুমঞ্জরি আর কুন্দ৷ হাস্নাহেনার নলাকার সাদাটে ফুল ফোটে সন্ধ্যায়৷ চারদিকে ছড়িয়ে দেয় সুগন্ধি আবেশ৷ সুগন্ধবাহী সাদা ও লাল রঙের মধু মঞ্জুরির ফুল ফোটে ঝুলন্ত থোকায়৷ কুন্দের ডালে দেখা মেলে গন্ধহীন গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা রঙের ফুল৷ ছাতিমের তীব্র গন্ধবাহী ফুল গন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে এর উপস্থিতির জানান দেয়৷ চারদিকে তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে এ সময় ফোটে দেব কাঞ্চনের হালকা বেগুনী বা সাদাটে ফুল৷
hasna
হেমন্তের ফুল হাস্নাহেনা
শীত আসলে মরসুমি ফুলের ঋতু৷ এ সময় বাগানে মরসুমি ফুলের জন্য নানা রকম কেয়ারী তৈরি করা হয়৷ এসব কেয়ারীতে কত রকম ডিজাইন করে লাগানো যায় জিনিয়া, সূর্যমুখী, ডালিয়া, কসমস, পিটুনিয়া, গাঁদা, লুপিন, চন্দ্রমলি্লকা, কার্ণেশন বা এস্টার একা একা কিংবা এদের নানা মাত্রার মিশেল৷ শীতকালেতো এক একটি বাগানে নানা বর্ণের ফুলের মেলা বসে৷ এদের জীবনকাল কম বটে তবে এরই মধ্যে বাগানে নিয়ে আসে এরা এক ভিন্ন আমেজ৷ শীতকালে জমে ওঠে মরসুমি ফুলের মেলা৷ ঠান্ডা আর শুষ্ক পরিবেশে বিদেশের নানা ফুল কি সুন্দর মানিয়ে নিয়েছে আমাদের বাগানে৷
6867684463_530025d41e_z
শীতের ফুল গাদা
শীতের খোলস ভেঙ্গে প্রকৃতিতে গাছে গাছে জেগে ওঠে নতুন পাতা৷ সুবজ কচিপাতায় বাতাসের আন্দোলনই বলে দেয় এসেছে ঋতু রাজ৷ কোন কোন গাছ আবার পাতা ঝরিয়ে কেমন ন্যাড়াও হয়ে পড়ে৷ বসন্তের শুরুতেই পলাশের পত্রহীন ডালে ফোটে থাকে গাঢ় কমলা রঙের ফুল৷ কনক চাঁপার হলুদ সুগন্ধি ফুলের থোকায় ভরে ওঠে গাছ৷ নীল মণিলতায় নিষ্পত্র লতায় দোলে নীল নীল ফুলের স্তবক৷ মাধবী লতার লতায় দোলে থোকা থোকা সাদাটে ফুলের থোকা৷
8554284528_d27b46bd93_b
বসন্তের ফুল শিমূল
কোন কোন ফুল আবার ঋতুর কড়া কড়ি পালা বদলের নিয়ম মানতে নারাজ৷ কোন কোন গাছ গ্রীষ্মে ফুল ফোটাতে ফোটাতে তা চলে যায় বর্ষায়ও৷ কাঁঠালিচাঁপা দেহজুড়ে তখন দেখা দেয় পাকা কাঁঠালের গন্ধবাহী সবুজাভ সাদা ফুল৷ জুঁই গাছের ডালে ডালে ফোটে ওঠে সাদা সুগন্ধি এক একটি ফুল৷ ঝুমকালতা আর মধুমালতির লতায় দোলে নানা রকম ফুল৷ কামিনীর সারা দেহ জুড়ে থোকায় থোকায় ফোটে ওঠে সাদা ফুল৷ বাতাসের মৃদু অন্দোলনে সে ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে৷ চাঁপার ডালে ডালে পাতার গোড়ায় ফোটে থাকে হলুদ, সোনালী কিংবা সাদা ফুল৷ করবীর মৌসুমও আসে তখন৷ বড় বড় থোকায় ধরে রক্ত, শ্বেত বা পদ্মকরবী ফুল৷ জহুরি চাঁপা কিংবা বেলী ফুলের বুক জুড়ে তখন আমোদে গন্ধ৷ হাস্নাহেনার ডালের আগায় থোকায় থোকায় ফোটে থাকে সাদাটে নলাকার ফুল৷ বসন্তে শুরু হয়ে গ্রীষ্মের খর তাপে হলুদ কমলা রঙের সুগন্ধিময় থোকা থোকা ফুলে ভরে ওঠে অশোকের ডাল৷ বসন্তে শুরু হয়ে কোন কোন ফুল গাছ আবার ফুল ফুটিয়ে চলে বর্ষা অবধি৷ সাদা পাপড়ির নাগেশ্বর ফুলের বুকে তখন সুগন্ধির প্রবল প্রতাপ৷
কোন কোন ফুল আবার থোড়াই কেয়ার করে ঋতুর বিভেদ৷ সংবেদনশীলতার বেড়াজালে নিজেকে আটকে রাখতে এরা রাজি নয়৷ প্রকৃতির মান অভিমানের খেলায় মগ্ন হতে এদের আকাংখা বড় বেশি নেই৷ আপন মনে ফুল ফুটিয়ে চলে কোন কোন গাছ প্রায় সারা বছর ধরেই৷ চার পাঁচ রকমের জবা ফুল রয়েছে আমাদের দেশে৷ প্রায় সারা বছর ধরেই এক একটি ফুল ধরতে থাকে এদের পাতার কক্ষে৷ এ রকমই আরো ফুল হলো নয়ন তারা, সন্ধ্যামণি বা কৃষ্ণকলি৷ গুল্ম জাতীয় রঙ্গনেরও লাল, হলুদ, সাদা কিংবা লালচে কমলা ফুল ফোটে প্রায় সারা বছর ধরেই৷ কোন কোন ফুল গাছ আবার বড় বেশী শীতকাতর যেন৷ কেবল শীত ছাড়া টগর আর অপরাজিতা ফোটে থাকে বছরের দশ মাসই৷ গ্রীষ্মের দাবদাহ পছন্দ নয় গন্ধরাজের৷ তাই বর্ষা থেকে বসন্ত এই পাঁচটি ঋতুতেই দেখা মেলে এ ফুলের৷ মাধুরী লতায় আবার ফুল ফোটতে দেখা যায় হেমন্ত থেকে গ্রীষ্ম পর্যন্ত৷ কোন কোন বাগান বিলাসের ফুল ফোটে শীত বসন্তে, তবে এমন জাতও রয়েছে এরা ফুল ফুটিয়ে যায় প্রায় সারা বছরই৷ শরত্‍ থেকে বসন্ত পর্যন্ত বড় বড় থোকায় ফোটে হালকা বেগুনি লতা পারুলের ফুল৷ এমনকি গ্রীষ্ম বর্ষায়ও এদের দেখা মেলে প্রায়শই৷ কলাবতীর ফুল ফোটে বছরে কয়েক বার৷ জাত ভেদে লম্বা ডাটায় এদের ফোটে থাকে থোকা থোকা হলুদ, কমলা, লাল নানা রকম ফুল৷ সারা বছরই কয়েকবার ফুল ফোটে রাঁধাচূড়ারও৷ একটি জাতের ফুল লাল – কমলা তো অন্যটিতে আবার ফোটে হলুদ ফুল৷
এটি বড় আনন্দের বিষয় যে, প্রায় সব ঋতুতেই এদেশে ফোটে কোন না কোন গাছের ফুল৷ পরিকল্পনা মাফিক কোন বাগানে সঠিক ফুল গাছ রোপন করে সারা বছরই পাওয়া সম্ভব কোন না কোন ফুল৷ বাগানে ফুল গাছের চারা রোপনের আগেই বিবেচনায় নিতে হয় কোন উচ্চতার গাছ কোথায় লাগানো হবে৷ তাছাড়া পছন্দ অনুযায়ী প্রজাতি বাছাইয়ের পাশাপাশি জাত বাছাইয়ের বিষয়টিতো রয়েছেই৷ তাছাড়া মরসুমি ফুলের ক্ষেত্রে উপযুক্ত নকশা অনুযায়ী গাছের উচ্চতার প্রসঙ্গটির পাশাপাশি কোন বর্ণের ফুল তৈরি করে সেসব জাত সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷
ফুলের প্রতি আকর্ষণ মানে মানুষের এক অন্তর্গত তাগিদের এটি বহিঃপ্রকাশ৷ মানুষের নান্দনিক চাহিদা পূরণের এক অতি সুন্দর উপকরণ হলো ফুল৷ ফুলের বাগান স্থাপন, গৃহের এক কোণে ফুল গাছ রোপন, গৃহের টবে বা ঝুলন্ত মাটির পাত্রে ফুলের গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের যান্ত্রিক জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারি৷ আমাদের জীবন বড় একঘেয়েমিতে ভরা৷ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে ক্লান্তি দূর করবো সে অর্থ ও আনুষঙ্গিক সুযোগ সুবিধা আমাদের অতি নগণ্য৷ নাগরিক জীবনের নানা রকম টানাপোড়েন অনেক সময় আমাদের কর্মস্পৃহাকে শ্লথ করে দেয়৷ একটি দ’ুটি ফুল গাছ, একটি দু’টি ফুলের টব কিংবা শিকেয় ঝুলানো একটি দু’টো ছোট ছোট ফুল গাছ শোভিত মাটির পাত্রে চোখ রেখে যে আনন্দময় অনুভূতির প্রকাশ মনে জেগে উঠে তাই মানুষকে এগুবার সঞ্জীবনী সুধার মত কাজ করে৷ নিজের হাতে একটি ফুলের চারা লাগিয়ে যত্ন নিন দেখবেন গাছে কি রকম ফুল ধরবে সেটি দেখার আকাংখায় আপনার দিনগুলো কি সুন্দর কেটে যায়৷

……………………………………….
ড.মোঃ শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া
প্রফেসর,কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ এবং প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর,
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,
শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *