সম্পাদকীয়

কম ভর্তুকির কৃষি বাজেট (২০১৩-১৪)
গত ৬ জুন ২০১৩ তারিখ জাতীয় সংসদে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেটে কৃষি খাতে এবার নয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সে হিসেবে ভর্তুকি অনেকটাই কমেছে। এবার অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন মিলে বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ১২ হাজার ২৭৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ কৃষি খাতে কমানো হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৬ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন বাজেটে ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, যা বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৬ শতাংশ কম। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ, ভূমি পরিবেশ ও বন, পল্লী উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকার ও পাট মন্ত্রণালয় মিলে সার্বিক কৃষি ও গ্রামীণখাতের বরাদ্ধ হ্রাস পেয়েছে ৭.৩৮%। মোট বাজেটে শস্য খাতে ২০১২-১৩ সালের সংশোধিত বাজেট ছিল ৭.৮৬% প্রস্তাবিত ২০১৩-১৪ সালের বাজেটে তা কমেছে ৫.৫১%। কৃষি খাতে ১০.৪৮% থেকে কমে ৭.৮৫% হয়েছে।
কৃষিতে ভর্তুকি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের ধনী দেশ গুলো কৃষি খাতে ব্যাপক ভর্তুকি দিলেও বাংলাদেশের মত একটি জনবহুল দেশে কৃষিতে ভর্তুকি কমানো হচ্ছে। ভর্তুকি দিলে উৎপাদন খরচ কমে কৃষিপণ্যের দাম কম থাকে এবং কৃষক ও ভোক্তা সন্তুষ্ট থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিতে এক টাকা ভর্তুকি দিলে ১৫ টাকা পর্যন্ত রির্টান আসে। গত তিন বছরের বাজেটে কৃষি বরাদ্দ কম থাকায় কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে, কৃষি পণ্যের দাম কম হওয়ায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ফলে কৃষিখাত এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং অলাভজনক হয়েছে। এজন্য কৃষি উৎপাদনে কৃষকদের আগ্রহ কমেছে। এবারও বাজেটে কৃষি বরাদ্দ কম প্রস্তাব করা হয়েছে। আর এ কারনে কৃষকরা ধানের পরিবর্তে অন্য যেকোন ফসল আবাদ করেন আবার কখনোবা জমি পতিত রাখেন। অন্যদিকে কৃষি ভর্তুকির বেশির ভাগ ব্যয় করা হয় রাসায়নিক সার খাতে। ফলে এ টাকা চলে যায় সরাসরি সার আমদানি কারক ব্যবসায়ীদের পকেটে। দেশে বর্তমানে ১ কোটি ৪৩ লক্ষ ৭৫ হাজার কৃষককে কৃষি উপকরণ কার্ড দেওয়া হয়েছে। ১০ টাকার বিনিময়ে প্রায় এক কোটি কৃষকের নামে ব্যাংক একাউন্ট খোলা হয়েছে। ভর্তুকির টাকা সরাসরি কৃষকের একাউন্টে দিলে ভর্তুকির ব্যবহার সঠিক হবে অনেকে মনে করেন।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, জিডিপিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাতের অবদান প্রায় ৭ থেকে ৮%। যা মোট কৃষিজ আয়ে ৩৫ থেকে ৪০%। মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ খাতে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন মিলে ১ হাজার ৬২ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। গত বছর এখাতে বরাদ্দ ছিল ৯৪৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। পোল্ট্রি খামারীদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য তহবিল গঠন করা হয়েছে। খামার আয়কর ও শুল্ক মুক্ত থাকবে। বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে যা প্রশংসার দাবী রাখে।
কৃষি প্রধান দেশের বাজেটে কৃষিখাতকে ভর্তুকি কমানোর ফলে কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা। মুদ্রা স্ফীতি বেড়ে যাওয়া সহ দারিদ্র বিমোচন বাধাগ্রস্ত হবে। পরিশেষে, কৃষির উন্নয়ন করতে হলেÑ ভর্তুকি বাড়াতে হবে এবং ভর্তুকি যাতে যথাযথ ব্যবহার হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কৃষি উপকরণের মূল্য কমানো ও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের জন্য একটি কৃষি মূল্য কমিশন গঠন করা দরকার দাবী সোচ্চার হচ্ছে। কৃষি ঋণের সুদের হার ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচানোর জন্য বাজেটে কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই। সর্বোপরি কৃষি ও কৃষকের বাজেট করার জন্য বাজেট প্রস্তাব পুর্নবিবেচনা করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *