সম্পাদকীয়

বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চাই সমন্বিত প্রচেষ্টা

দেশের আঠারটি জেলা ভাসছে বানের পানিতে। পানিবন্দি হয়ে ৫০ লাখ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। টানাবর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন এলাকা, তলিয়ে যাচ্ছে ফসলের ক্ষেত। রংপুর, নীলফামারি, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, জামালপুর, ময়মনসিংহ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারিপুর, মুন্সিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা এবং ঢাকার আশপাশের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এসব এলাকার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় খাদ্য, পানি ও জ্বালানি সঙ্কটে পড়েছে পানিবন্দী মানুষ। বিভিন্ন জেলায় পানিতে ডুবে নারী ও শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি ও সবজি বাগান। পানি বৃদ্ধির কারণে অনেক এলাকার পুকুর, ডোবা, ঘের তলিয়ে গেছে। এতে করে এসব জায়গায় চাষ করা মাছ ভেসে গেছে পানির তোড়ে। এছাড়াও বানের পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় অনেক এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পদ্মায় তীব্র স্্েরাত থাকায় আরিচা-দৌলদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, ব্রিজ, কালভার্ট, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। পানিবন্দি হয়ে পড়ায় অনেক এলাকায় শ্রমিকদের কাজ-কর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে অতি দরিদ্র শ্রেণির মানুষের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। দুর্গত কয়েকটি এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই সামান্য। বন্যাকবলিত অনেক এলাকায় বিশেষ করে প্লাবিত চরাঞ্চলগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার খবর পাওয়া গেছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্র বিভিন্ন এলাকা থেকে গবাদিপশু, ছাগলসহ বাড়ী ঘরের মালামাল তুলে নিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। কুড়িগ্রামের রৌমারিকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় যে হারে পানি বাড়ছে তাতে করে আরও কয়েকটি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবরে প্রকাশ।

কৃষিতে বন্যার ক্ষতির প্রভাব পড়ে দীর্ঘমেয়াদি। এ কারণে কৃষক ভাইদের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে,বন্যার পানি নেমে যাবার সাথে সাথে সব ধরণের ফসলের যতœ ও রবি ফসল চাষাবাদ কার্যক্রম যথারীতি চালিয়ে যেতে হবে। রোপা আমন ধানের আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ জমিতে, ভাল জায়গার সুস্থ গুছি থেকে কিছু অংশ তুলে নিয়ে ফাঁকা জায়গা পূরণ করে দিতে হবে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর পরই চারার পাতার ৮-১০ সেঃ মিঃ (৩-৪ ইঞ্চি) আগা কেটে দিন এবং ছত্রাকনাশক স্প্রে করে দিতে হবে। চারা না পাওয়া গেলে স্থানীয় জাতের আউশ ধান (হাসিকলমি, সাইটা, গড়িয়া) এর গজানো বীজ  আশ্বিনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ছিটিয়ে বোনা যেতে পারে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর মরিচ ও ডাল জাতীয় ফসলের সাথে আশ্বিন মাসে পাটের বীজ বোনা যেতে পারে। বন্যার পানি নেমে গেলে বিনা চাষে গিমাকলমি, লালশাক, ডাটা, পালং, পুঁইশাক, ধনে, সরিষা, খেসারী, মাসকালাই আবাদ করা যেতে পারে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ শাকসব্জি ও অন্যান্য ফসলী জমির রস কমনোর জন্য মাটি আলগা করে ছাই মিশিয়ে এবং সামান্য ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। এবছর লাগানো  ফলের চারার গোড়ার পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে গোড়ায় মাটি দিয়ে সোজা করে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। বন্যার পানি নেমে যাবার সাথে সাথে ভাসমান কঁচুরি পানার ওপর লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া ও অন্যান্য সবজির তৈরি চারা নির্ধারিত জায়গায় বসিয়ে দিতে হবে।

পরিশেষে, জাতীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি তথা অব্যাহত রাখার স্বার্থে বন্যা পরবর্তী কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এ জন্য সরকারি বেসরকারি সংস্থা থেকে সমন্বিত পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *