সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ: দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ

মাছ আমাদের আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। আমিষের চাহিদা পূরণে মাংসের পরেই মাছের স্থান। বাঙ্গালীর খাবার তালিকায় দৈনন্দিন মাছ যেন এক আবশ্যক উপাদান। তাইত এদেশের মানুষের আর এক পরিচয় ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালী’। দেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে চতুর্থ। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে আমাদের দেশের অবস্থান পঞ্চম। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশাল জনগোষ্ঠীর এই ছোট্ট দেশে মানুষের আমিষের চাহিদা মিটানোর প্রধান উৎস মাছ। জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দেশের অজস্র খাল-বিল নদী-নালায় যে বিপুল আমিষ-সম্পদ রয়েছে, তা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির কাজে লাগাতে হবে। নতুবা অনিয়ন্ত্রিতভাবে মুক্ত জলাশয়ের মাছ সংগ্রহ করার ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাবে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশের প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ মৎস্য উৎপাদন, আহরণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ডের সহিত জড়িত রয়েছে। জিডিপিতে প্রায় চার শতাংশ অবদান রেখে চলেছে মৎস্য খাত। এই খাতে গত সাড়ে ছয় বৎসরে মৎস্যচাষি ও মৎস্যজীবীদের আয় ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে সাড়ে ছয় লক্ষেরও অধিক মানুষের ।
কিন্তু পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের অসংখ্য বিল-বাঁওড় ও নদী-খাল হতে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। প্রাকৃতিক উৎসে জন্মানো কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, চিতল ও বোয়াল প্রভৃতি সুস্বাদু দেশীয় মাছ এখন বিরল প্রজাতির মাছের তালিকার ঝুকিতে রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের অনেক হাট-বাজারেও আজকাল দেশীয় প্রজাতির মাছের চেয়ে বেশির ভাগই খামারে উৎপাদিত বিদেশি জাতের হাইব্রিড মাছ যেমনঃ শিং, মাগুর, কৈ, চিতল, পাঙ্গাস পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, ৫৩ প্রজাতির দেশিয় মাছ বিলুপ্তির পথে। ব্যাপকহারে ২৪ প্রজাতির বিদেশি হাইব্রিড মাছ চাষের কারণে বিলুপ্তির হুমকিতে আছে দেশি আড়াই শতাধিক প্রজাতির মাছ। এছাড়াও কৃষিজমিতে যথেষ্ট কীটনাশক ও মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহারের ফলে পানিতে বিষাক্ততা বাড়ছে। সেই বিষাক্ত পানি নদী-নালা, খাল-বিলে মিশছে। এর ফলে নদীনালা ও জলাশয়সমূহের মাছে নানা রকমের রোগ ব্যাধি দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এ সব রোগ ছোঁয়াচে হওয়ায় একটি মাছ থেকে অন্য মাছে ছড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে কারেন্ট জালের দৌরাত্ব যেন থামছেই না। তার উপর এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নদীতে ঘের বা প্রবাহ বাধাগ্রস্থ করে দেশীয় প্রজাতির মাছের ব্যাপক ক্ষতি করছে। এ প্রেক্ষাপটে ‘সাগর নদী সকল জলে, মাছ চাষে সোনা ফলে’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবারের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২৮ জুলাই-০৩ আগষ্ট পালন করা হয়।
পরিশেষে, মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য প্রজাতির মধ্যে বিদ্যমান বাস্তুতন্ত্র (ঊপড়ংুংঃবস) যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সেজন্য নদী খাল জলাশয় ভরাট হলে পুনঃখনন করতে হবে। সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী, খাল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়েও অনৈতিকভাবে যে মাছ চাষ হচ্ছে,তা দ্রুত বন্ধ করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবী।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare