সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প

আমাদের অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় বড় একটি খাত চামড়া শিল্প। এ শিল্পের উৎপাদিত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। ১৯৯০-এর দশকে এ শিল্পে বার্ষিক গড় রফতানি আয় ছিল ২২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে চামড়া রফতানি থেকে আয় হয় ২২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চামড়াজাত পণ্য থেকে রফতানি আয় হয় ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১০-১১ অর্থবছরে চামড়া রফতানি থেকে আয় হয় ২৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয় ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১১-১২ সালে এ খাতে মোট রফতানি আয় দাঁড়ায় ৭৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে চামড়া, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে ৯৮ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ।

কিন্তু এ শিল্পের বড় সমস্যা হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। কোরবানির ঈদে যে পশু কোরবানি হয় তা হলো কাঁচা চামড়ার অন্যতম প্রধান উৎস। গ্রামের বা ঢাকার বাইরে চামড়া ক্রয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকায় চামড়ার সঠিক মূল্য পাওয়া যায় না। দালাল ফড়িয়ারা এগুলো বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিভিন্ন দামে সংগ্রহ করে। গ্রাম থেকে উপজেলা ও জেলা হয়ে ঢাকা পর্যন্ত কয়েক স্তরবিশিষ্ট মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। চামড়ার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করার ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বা দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। কাঁচা চামড়া থেকে চর্বি বা গোশত ছাড়ানোর সময় চামড়া কেটে যায়, যা চামড়ার গুণগতমান কমিয়ে দেয়। গ্রাম বা পল্লী এলাকায় প্রাচীন বা গতানুগতিক পদ্ধতিতে পশু থেকে চামড়া খোলা হয়। কাঁচা চামড়া সঠিক নিয়মে প্রক্রিয়াজাতকরণ না করার কারণে এর গুণগতমানও হ্রাস পায়। বাংলাদেশে গরু-ছাগলের স্টকও অপর্যাপ্ত। আমাদের দেশে বড় আকারের খামার গড়ে ওঠেনি। ফলে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে প্রতিবছর প্রচুর গরু আমদানি করতে হয়। অথচ পরিকল্পিত উপায়ে যথাযথভাবে এ খাত সমৃদ্ধ করা হলে আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে।

চামড়া শিল্পের মানোন্নয়নে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষিত জনবল  তৈরির লক্ষ্যে আরো লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউট স্থাপন, চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা গ্রহণ, চামড়া শিল্পের জন্য আলাদা শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা, চামড়া শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা, ব্যবসায়ীদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানির বিপরীতে পাওনা শুল্ক ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা নেয়া, চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব দূরীকরণ, চামড়া প্রক্রিয়াকরণে লবণ ও অন্যান্য ব্যবহৃত কেমিক্যালের মূল্য না বাড়ানো, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাড়াতে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে আরো কার্যকর করা প্রয়োজন। তাছাড়া চামড়া শিল্পের উন্নয়নে অবশ্যই বড় আকারের খামার গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার বার্ষিক চাহিদার প্রায় শতকরা ৪৫ ভাগ আসে কোরবানির পশু থেকে। আসছে কোরবানির ঈদে সঠিক ব্যবস্থাপনা, বাজার মনিটরিং, দ্রুত সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এ খাতের বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ীরা যাতে লাভবান হতে পারেন এবং উন্নতমানের চামড়া প্রস্তুত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে । শুধু চামড়া উৎপাদন নয়, বহুমুখী চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। এ খাতের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ঘটুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

২। প্রতিবছরের ন্যায় ত্যাগের মহিমা নিয়ে আবার আসছে পবিত্র ঈদুল আজহা। আমাদের সকল পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়িদের প্রতি রইল ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare