সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে তিতির

আবুল বাশার মিরাজ

তিতির। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের কাছে পাখিটি বেশ অপরিচিত। কারণ এটি সচরাচর দেখা যায় না। প্রায় ৭’শত বছর আগে বন-জঙ্গল থেকে গৃহপালিত পাখির কাতারে আসা আফ্রিকান এ পাখিটি ইউরোপ হয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ সময়ে আসে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায়। এদেশে চীনা মুরগি বা চায়না মুরগী হিসেবে পাখিটির সামান্য পরিচিতি ঘটলেও বাণিজ্যিক পোল্ট্রির দাপটে পড়েছিল বিলুপ্তির মুখে। যদিও বহু প্রাচীনকালে বনে জঙ্গলে এই তিতির পাখির অবাধ বিচরণ ছিল। একটি সময় এসে এই তিতির পাখি গৃহপালিত পশুপাখির তালিকায় স্থান করে নেয়। শখের বশে অনেকেই এই তিতির পাখি পালন করতো। সাধারণত তিতির পাখি তিন ধরণের হয়- কালো তিতির, বাদামী তিতির ও মেটে তিতির।

আই. ইউ.সি.এন. প্রজাতিটিকে খবধং: ঈড়হপবৎহ বা আশঙ্কাহীন বলে ঘোষণা করেছে। তবে বাংলাদেশে এরা মহাবিপন্ন (ঈৎরঃরপধষষু বহফধহমবৎবফ) বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত। এত কিছুর পরও বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এই পাখিটির বাণিজ্যিক লালন-পালনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পরিচালিত  বাকৃবির পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে চলছে পাখিটির সংরক্ষণ এবং সম্প্রসারণ।

২০১০ সাল থেকে বাকৃবির পোল্ট্রি খামারে তিতির পালন শুরু হয়। দীর্ঘ ৬ বছর ধরে গবেষণার পর পাখিটির সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদীয় পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস। এরইমধ্যে দেশের সর্বত্রই এই পাখি ছড়িয়ে দিতে বিনামূল্যে অনেককেই তিনি তিতির পাখি বিতরণ করেছেন।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বাকৃবির পার্শ্ববর্তী বয়ড়া গ্রামে তিতির পাখি বিতরণ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োাজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন পশুপালন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এস. ডি. চৌধুরী, বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্স সিস্টেম (বাউরেস) এর পরিচালক এবং শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. লুৎফুল হাসান। অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন প্রকল্প পরিচালক ও বিশিষ্ট পোল্ট্রি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. সুভাষ চন্দ্র দাস। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত পোল্ট্রি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. আশরাফ আলী, পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. ফৌজিয়া সুলতানা, বয়ড়া ইউনিয়নের চেয়্যারম্যান আবদুল মালেক এবং পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স এর শিক্ষার্থীবৃন্দ ও স্থানীয় লোকজন।

এখন উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিতির পালন ছড়িয়ে দিতে কাজ শুরু করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে তিতির পালনের জন্য বেশ কিছু খামার গড়ে উঠেছে। গবেষক জানান, তিতিরের তিনটি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রজাতির তিতির নিয়ে গবেষণা করে সম্প্রসারণে সফলতা পেয়েছেন। মেলিয়াগ্রিডের পরিবারের এক ধরণের বৃহদাকৃতির পাখি এটি। তিনি যে প্রজাতিরও তিতির নিয়ে গবেষণা করেছেন সেটির বৈজ্ঞানিক নাম ঘঁসরফধ সবষবধমৎরং। বাচ্চা দেখতে মুরগীর বাচ্চার মত হলেও পরিপূর্ণ বয়সে বদলে যায় আকৃতি ও চেহারা। এ প্রজাতির তিতিরের দৈর্ঘ্য কমবেশি ৩৪ সেন্টিমিটার, ডানা ১৫ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ২.৪ সেন্টিমিটার, পা ৪.৮ সেন্টিমিটার ও লেজ ১০ সেন্টিমিটার। পুরুষ ও স্ত্রী তিতিরের চেহারা ভিন্ন। সচরাচর একাকী কিংবা জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়ায় এই পাখিটি। খাদ্যতালিকায় রয়েছে বীজ, শস্যদানা, কচি কান্ড, ফল ও পোকামাকড়। ঊষা ও গোধূলিতে এরা বেশি কর্মচঞ্চল হয়। এসময় স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষè স্বরে ডাকে- চিক..চিক..চিক.. ক্রেকেক।

গবেষক আরও জানান, সংক্রমণ বা পরজীবী তিতিরকে সহজে আক্রমণ করতে পারে না। ফলে খামারে তিতির পালন করতে আলাদা কোন ভ্যাকসিন কিংবা ঔষুধের প্রয়োজন হয় না। প্রতিকূলতার সঙ্গে বাণিজ্যিক মুরগি চলতে না পারলেও তিতির চলতে পারে। বছরে একটি তিতির ১০০ থেকে ১২০টি ডিম দেয়। ডিমগুলো হলদে জলপাই থেকে হালকা জলপাই বাদামী বর্ণের হয়। ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন ও পালনের সবগুলি ধাপ বাকৃবি গবেষণা খামারে শেষ হওয়ার পর এখন তিতির ছড়িয়ে পড়ছে উদ্যোক্তাদের খামারে। এক একর জমিতে আমরা ৩০০-৩৫০ টি পূর্ণ বয়স্ক তিতির পালন করা যায়। রাতে পাখী প্রতি ৩ থেকে ৪ বর্গফুট জায়গার প্রয়োজন হয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জে অনেক জায়গা অনাবাদী পতিত অবস্থায় পরে থাকে। যেখানে প্রাকৃতিক ভাবে জন্মে রয়েছে বিভিন্ন ঘাস লতাপাতা। এরকম উন্মুক্ত জায়গা তিতির পালনের জন্য বেশ উপযোগী। অন্য দিকে আমাদের রয়েছে এক বৃহত্তর বেকার জনগোষ্ঠী। তাই একদিকে অব্যবহৃত জমিকে ব্যবহার এবং বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান, এই দুই এর মাঝে সেতু বন্ধন হতে পারে ছোট একটি তিতির খামার। কারণ,

১. একটি আদর্শ তিতির খামার করতে খুব বেশী পুঁজির প্রয়োজন হয় না।

২.অন্যান্য পাখীর তুলনায় এর রোগ বালাই কম এবং কিছু নিয়ম মেনে চললে এই খামারে ঝুঁকি অনেক কম। ৩.খাবারের খরচ কম ।

৪.বাজারে চাহিদা প্রচুর ।

৫. উচ্চ মূল্য থাকায় খরচের তুলনায় আয় অনেক বেশী

গবেষক জানান, খামারে তিতির পালন করে দারিদ্র বিমোচন করা সম্ভব। তিতির পাখির বাজার মূল্য হাঁস-মুরগির চেয়ে অনেক বেশি। তাই এটি পালন মুরগির চেয়েও লাভজনক। তিনি বলেন, দেশী মুরগি খামারে ৬ মাসে সাত’শ আট’শ গ্রাম বা সর্বোচ্চ এক কেজি ওজনের হয়। কিন্তু তিতির পাখি পনের’শ থেকে ষোল’শ গ্রামের হয় বা তার বেশিও হয়ে থাকে। তিতিরের মাংস বেশ পুষ্টিকর ও সুস্বাদু হওয়ায় এটি খাদ্য তালিকার একটি আদর্শ মাংস হতে পারে। পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাংসের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে।

যাদের অতিরিক্ত চর্বি যুক্ত মাংস খাওয়া নিষেধ অথবা যারা নিজেরাই এড়িয়ে চলেন, কিংবা যারা গরু কিংবা খাসীর মাংস খায়না, তাদের জন্য হতে পারে প্রিয় একটি বিকল্প। তাছাড়া বিয়ে, বৌ ভাত, জন্মদিন সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খাসী-গরুর মাংসের বিকল্প হিসেবে তিতির মাংস হতে পারে অতি উৎকৃষ্ট একটি খাবার। এ কারণে বাজারে তিতিরের চাহিদা ও মূল্যও মুরগির চেয়ে প্রায় কয়েকগুণ বেশি। বাজারে প্রতিটি তিতির ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন তিতিরের খাদ্য খরচ পোল্ট্রি বা দেশী মুরগীর তুলনায়ও অনেক কম হওয়ায় খামারীরাও পাখিটির বাণিজ্যিক পালনে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছেন। দেশের মাংস চাহিদা পূরণের পাশাপাশি  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

———————————–লেখকঃ

শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

মোবাইলঃ ০১৭৪৪ ৪৩১০৪০

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare