সরিষা ফসলের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি

মাটি ও আবহাওয়া
সরিষা বেলে দোআঁশ মাটিতে ভাল জন্মে৷ মাঝারি ও মাঝারি উঁচু জমি এ সরিষার জাতের জন্য নির্বাচন করা উচিত৷ জলাবদ্ধতা অত্যন্ত ক্ষতিকর৷ সরিষা চাষের জন্য পর্যাপ্ত সূর্যকিরণ, কম তাপমাত্রা (২৫০ সেঃ এ কম) এবং জমিতে পর্যপ্ত রস থাকা প্রয়োজন ৷ তাপমাত্রা বেশি হলে ও খরা হলে বীজের আকার ছোট হয় ও বীজে তেলের ভাগ কমে যায়৷
জমি তৈরী
সরিষার বীজ ছোট বিধায় ৪-৬ টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হয়৷ জমিতে যাতে বড় বড় টিলা ও আগাছা না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে৷
সারের পরিমাণ

 

Table-1
জাত মাটি এবং মাটিতে রসের তারতম্য অনুসারে সরিষার জন্য বিভিন্ন পরিমাণ সার দিতে হয়৷
সরিষার বিভিন্ন জাতের জন্য সারের পরিমাণ
উপরোক্ত সারের মাত্রা বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চল ও জমির উর্বরতা ভেদে কম বেশি হতে পারে৷
সার প্রয়োগ পদ্ধতি
অর্ধেক ইউরিয়া এবং অন্য সারগুলোর সব টুকু শেষ চাষের আগে জমিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে৷ বাকি অর্ধেক ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ হিসেবে চারা গজানোর ২২-২৫ দিন পর অর্থাত্‍ ফুল আসার আগে প্রয়োগ করতে হরে৷
বপনের সময় ও বীজের হার
সাধারণত আশ্বিন মাসের শেষ থেকে কার্তিক মাসের শেষ পর্যন্ত (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) এ জাত দু’টি বপন করার উপযুক্ত সময়৷ দেরীতে বপন করলে ফলন কমে যায়৷ দেশের উত্তর অঞ্চলে আগাম শীত আসার কারণে সেখানে আগাম বপন করা সম্ভব৷ আমন ধান কাটার পর বেশি দেরি না করে সরিষা বপন করা উচিত৷
বিভিন্ন অঞ্চলের তারতম্য ও জমির জো অবস্থা অনুসারে টরি-৭, টি এস-৭২ এবং এস এস-৭৫, বারি সরিষা-৬ (ধলি), বারি সরিষা-৭ ও বারি সরিষা-৮ আশ্বিনের মাঝামাঝি থেকে কার্তিক পর্যন্ত বোনা যায়৷ রাই -৫ দৌলত ও বারি সরিষা-১০ কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি পর্যন্ত বপন করা যেতে পারে৷ টরি-৭ ও টি এস -৭২ এর জন্য প্রতি হেক্টরে বীজের হার হচ্ছে ৮ কেজি (প্রতি একরে ৩.৫ কেজি)৷ সোনালী, ধলি নেপাস সরিষার বীজ আকারে বড় বিধায় প্রতি হেক্টরে ৯ কেজি (প্রতি একরে ৪.৫ কেজি) বীজ লাগে৷ রাই -৫ ও দৌলত সরিষার বীজ ছোট বলে কম লাগে, তাই প্রতি হেক্টরে ৭.৫ কেজি (প্রতি একরে ৩ কেজি ) বীজ লাগে৷
বীজের হার

Table-2

বপন পদ্ধতি
সারিতে এবং ছিটিয়ে উভয় পদ্ধতিতেই সরিষা বীজ বপন করা যায়৷ সারিতে বুনলে সারির দুরত্ব ৩০ সেঃ মিঃ এবং সারিতে বীজ লাগাতার বপন করতে হয়৷ সারিতে বুনলে পরবর্তীতে আগাছা দমন ও অন্যান্য অন্তর্বতী পরিচর্যা করা সহজ হয়৷ সারি তৈরির জন্য লোহার তৈরি টাইন অথবা কাঠের ছোট লাঙ্গল ব্যবহার করা যেতে পারে৷ আড়াই থেকে তিন সেঃমিঃ গভীরে বুনলে শেষ চাষের পর বীজ বপন করতে হবে এবং মই দিয়ে জমি সমান করে দিতে হবে৷ সরিষার বীজ ছোট বিধায় বপনের সুবিধায় জন্য বীজের সঙ্গে ঝুরঝুর মাটি অথবা ছাই মিশিয়ে নেওয়া যেতে পারে৷
চিত্র: সারিতে সরিষা বীজ বপন
সেচ পদ্ধতি
সরিষা চাষের জন্য জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকা প্রয়োজন সেজন্য জমিতে রসের অভার দেখা দিলে সেচ প্রয়োগ করতে হয়৷ কখনো কখনো বপনের সময় জমিতে রসের অভাব থাকে সেক্ষেত্রে বপনের আগেই সেচ দিয়ে রসের ব্যবস্থা করতে হবে৷ ফুল আসার আগে অর্থাত্‍ ২২-২৪ দিনে, শুজি হওয়ার সময় অর্থাত্‍ ৫০-৫৫ দিনে এবং শুটিতে বীজ পরিপুষ্ট হওয়ার সময় অর্থাত্‍ ৭০-৭৫ দিনে জমিতে রস থাকা প্রয়োজন৷ কাজেই এ সময়ে রসের অভাব দেখা দিলে সেচ দেয়া বাঞ্চনীয়৷ সরিষার জমিতে সাধারণত প্লাবন পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া হয়৷ তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে সেচের পানি জমিতে আটকে না থাকে৷ ফোয়ারা পদ্ধতিতে সরিষার জমিতে সেচ দেওয়া উত্তম৷
পরিচর্যা
চারা গজানোর ১০-১২ দিনে প্রথমবার এবং ১৮-২০ দিনে দ্বিতীয়বার নিড়ানি দিয়ে অতিরিক্ত চারা এবং আগাছা উঠিয়ে ফেলতে হবে৷ প্রতি বর্গমিটার জমিতে ৫০-৬০ টি সরিষার গাছ থাকা বাঞ্চনীয়৷ সেচের পর জমিতে জো আসার সাথে সাথে কোদাল অথবা নিড়ানি দিয়ে মাটি আলগা করে দিলে জমিতে রস বেশি দিন থাকবে৷
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন
সরিষার প্রধান ক্ষতিকারক পোকা জাব পোকা৷ এ পোকার আক্রমণ বেশি হলে ম্যলাথিয়ন ৫৭ ইসি অথবা মার্শাল ২০ ইসি অথবা জুলন ৩৫ ইসি অথবা সেবিয়ন ৬০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিঃ লিঃ অথবা বেনিক্রন ১০০ ডাবু ইসি প্রতি লিটার পানিতে ১ মিঃলিঃ হিসেবে মিশিয়ে সম্পূর্ণ গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে৷
রোগবালাই দমন
১৷ পাতা ঝলসানো রোগ
আমাদের দেশে সরিষার রোগসমূহের মধ্যে পাতা ঝলসানো রোগ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর ৷ এ রোগের আক্রমণে ফসল ২৫-৩০% কমে যেতে পারে বলে গবেষণা ফলাফলে দেখা যায়৷
রোগের কারণ
অলটারনেরিয়া ব্রাসিসী, অলটারনেরিয়া ব্রাসিসীকোলা নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ সৃষ্টি হয়৷
রোগের লক্ষণ
সরিষা গাছের এক মাস বয়স থেকে শুরু করে বৃদ্ধির যে কোন পর্যায়ে এ রোগ হতে পারে৷ প্রাথমিক অবস্থায় সরিষা গাছের নিচের বয়স্ক পাতায় এ রোগের লক্ষণ পরিলক্ষতি হয়৷পরবর্তীতে গাছের পাতা এবং শুঁটিতে গোলাকার, গাঢ় বাদামী দাগের সৃষ্টি হয়৷ দাগগুলো ধূসর, গোলাকার সীমারেখা দ্বারা আবদ্ধ থাকে৷ অনেকগুলো দাগ একত্রিত হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে৷ আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে পাতা ঝলসে যায়৷ পরবর্তীতে সরিষার শুঁটিতে আক্রমণ করে এবং শুঁটি ও বীজ হতে খাদ্য গ্রহণ করার ফলন মারাক্তকভাবে হ্রাস পায়৷
রোগের উত্‍পত্তি ও বিস্তার
আক্রান্ত বীজ, বিকল্প পোষক ও বায়ুর মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে৷ বৃষ্টি ও ঠান্ডা আবহাওয়অ এ রোগ বৃদ্ধির সহায়ক৷
রোগের প্রতিকার
ক) সুস্থ, সবল, জীবাণুমুক্ত বীজ বপন করতে হবে৷
খ) আগাম বীজ বপনঃ আগাম সরিষা চাষ অথর্াত্‍ অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের ১ম সপ্তাহের মধ্যে সরিষার বীজ বপন করলে এ রোগের আক্রমণ কম হয়৷
গ) বীজ শোধনঃ বপনের পূর্বে বীজ প্রভেক্র-২০০ দ্বারা শতকরা ০.২৫ ভাগ হারে (২.৫ গ্রাম ছত্রাকনাশক/ কেজি বীজ) শোধন করে বপন করতে হবে৷
ঘ) ছত্রাকনাশক প্রয়োগঃ এ রেগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে রোভরাল-৫০ ডবি্লউপি শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক) পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন অন্তর ৩ বার সিঞ্চন যন্ত্রের সাহায্যে সমস্ত গাছে ছিটিয়ে এ রোগের আক্রমণ থেকে ফসলকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব৷
ঙ) ফসল কর্তনের পর আক্রান্ত গাছের পাতা জমি থেকে সরিয় অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে৷
চ) জমিতে শস্য পর্যায় অনুসরণ করলে রোগের প্রাদুর্ভাব কম হয়৷

লেখক :
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ প্রজনন)
তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বি.এ.আর.আই, গাজীপুর৷
মোবাঃ ০১৬৭৩১৬৭৯০৮, ই.মেইলঃ  mhasan.bari12@gmail.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *