সুপারির রোগ ও তার প্রতিকার

ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান

সুপারি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল বিশেষত সমুদ্র উপকুলবর্তী এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ফসল। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পান, চুন ও মসলার সাথে চিবানোর জন্য সুপারির প্রচলন খুবই প্রাচীন। অর্থকরী ফসল হিসাবে অথবা সৌন্দর্যের জন্য অনেক বাড়ির আশেপাশে, পুকুর পাড়ে, রাস্তার ধারে, বাড়ির  প্রবেশ পথে সারি করে সুপারি গাছ লাগানো হয়। সুপারি বাংলাদেশে প্রধান অর্থকরী ফসলের মধ্যে একটি অন্যতম ফসল। সুপারি চাষ বেশ লাভজনক। দেশের চাহিদা মিটানোর জন প্রতি বছর বিদেশ থেকে সুপারি আমদানি করতে হয়। তাই দেশেই বেশি করে সুপারি চাষ করে স্বনির্ভর হওয়া যায় বা অতিরিক্ত উৎপাদন করতে পারলে বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে। প্রতি বছর সুপারি চাষিরা রোগ ও পোকা-মাকড় দ্বারা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। সুপারী গাছ ও ফল বিভিন্ন প্রকার রোগ পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয়। সুপারির রোগ সম্পর্কে এ দেশে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। কিছু কিছু রোগের আক্রমণে সুপারির ফলন মারাত্মকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়। নিচে সুপারির প্রধান কয়েকটি রোগ ও তার দমন পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

১। রোগের নামঃ পাতার দাগ (Leaf Spot/Leaf Blight) রোগ

রোগের কারণঃ পেস্টালোশিয়া পালম্যারাম (Pestalotia palmarum) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ দাগের মধ্যে উৎপন্ন কণিডিয়া বাতাস এবং বৃষ্টির ঝাপটার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে এবং নতুন স্থানে আক্রমণ ঘটায়। পটাশ সারের ঘাটতি বা নাইট্রোজেন সারের আধিক্য এ রোগ বিস্তারে সহায়তা করে। খরা বা শুকনা মৌসুমে বিশেষ করে শীতকালে রোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়।

রোগের লক্ষণ

  •              নার্সারীর ছোট চারা গাছ বা বড় গাছ সব ক্ষেত্রেই এ রোগের আক্রমণ হতে দেখা যায়।
  •              রোগের আক্রমণে পাতার উপর ছোট মরিচা রংয়ের বিভিন্ন ধরণের দাগের সৃষ্টি হয়।
  •              দাগের চতুর্দিকে হলুদ বলয় সৃষ্টি হয়।  ছোট দাগগুলো বড় হতে থাকে এবং কিছু দাগ একত্রিত হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে।
  •              বড় দাগের কেন্দ্র ধুসর বা ধুসর বাদামী রঙ ধারণ করে।
  •              দাগের মধ্যে জীবাণুর বীজকণা (কণিডিয়া) উৎপন্ন হয়।
  •              ব্যাপক রোগাক্রান্ত পাতা ঝলসে যায় ও পোড়া মনে হয়।

রোগের প্রতিকার

  •              গাছের রোগাক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে।
  •              খরা মৌসুমে চারা গাছে সেচ ও সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে।
  •              ১.৫ কেজি পটাশ সার তিন ভাগ করে বছরে তিন বার গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে।
  •              কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম অথবা প্রোপিকোনাজোল গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-টিল্ট ২৫০ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে গাছের পাতায় ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার গাছে  স্প্রে করতে  হবে।

২। রোগের নামঃ ফল পচা (Nut rot/Fruit rot) রোগ

রোগের কারণঃ ফাইটোফথোরা এরিকি (Phytophthora arecae ) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ গাছের নিচে পড়ে থাকা রোগাক্রান্ত গাছের অংশে জীবাণু দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। অতি বৃষ্টির সাথে এ রোগের আক্রমণ ও বিস্তার নির্ভরশীল। তাই বেশী বৃষ্টিপাতযুক্ত এলাকাতেই এ রোগের আক্রমণ বেশী দেখা যায়। অপরদিকে কম বৃষ্টিপাতযুক্ত এলাকায় রোগের আক্রমণ তেমন দেখা যায় না। বর্ষাকালে বৃষ্টি শুরু হওয়ার সময় রোগ আত্মপ্রকাশ করে এবং পুরা বর্ষাকাল উপস্থিতি বজায় রাখে।

রোগের লক্ষণঃ

  •              জীবাণু বিভিন্ন বয়সের ফলকে আক্রমণ করে, এ সময় দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে রোগ কান্ডে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যায়ে গাছ মারা যেতে পারে। া প্রথমে কচি ফল অথবা কাঁচা ফলের বোঁটার দিকে খোসার উপর পানি ভেজা ছোপ ছোপ দাগ দেখা দেয়।
  •              আস্তে আস্তে অনেকগুলো দাগ একত্রে মিশে সুপারির উপর বড় আকার ধারণ করে।
  •              আক্রান্ত স্থান ক্রমান্বয়ে বাদামী ও ছাই রংয়ের হয়ে এক সময় পূরো সুপারিটাই রোগাক্রান্ত হয়ে যায় ।
  •              আক্রান্ত ফলগুলো পচে ঝরে পড়ে। া ঝরে পড়া ফলের উপর জীবাণু সাদা স্তর তৈরী করে যাতে অনেক বীজকণার সৃষ্টি হয়।
  •              এখান থেকে জীবাণু গাছের পাতায় ও কান্ডে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুনভাবে আক্রমণ ঘটায়।
  •              মাঝেমধ্যে এই রোগে আক্রমণের ফলে সুপারী গাছের মাথা মরে যায়।
  •              আক্রান্ত গাছ ২/১ মৌসুমের মধ্যেই মারা যেতে পারে।

রোগের প্রতিকার

  •              সুস্থ গাছ থেকে বীজ ফল সংগ্রহ করতে হবে।
  •              আক্রান্ত গাছের সুপারি ছড়াসহ এবং নীচে পরে থাকা সুপারি সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে।
  •              গোড়ায় পানি জমে থাকলে তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  •              বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ছিদ্রযুক্ত পলিথিন ব্যাগ দ্বারা ফলের ছড়াটি ঢেকে দিলে রোগের আক্রমণের সম্ভাবনা কমে যায়।
  •              বর্ষা মৌসুমের শুরুতে একবার এবং মাঝামাঝি সময়ে আর একবার মোট ২ বার বোর্দো মিক্সচার (প্রতি লিটারে ১০ গ্রাম তুতে ও ১০ গ্রাম চুন)  স্প্রে  করতে হবে। াগাছে মোচা বের হওয়ার কিছু আগে মেটালে´িল+মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-রিডোমিল গোল্ড) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর গাছে ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

৩। রোগের নামঃ মুকুল শুকিয়ে যাওয়া বা গুটি ঝরা (Inflorescence drying or bud dropping) রোগ

রোগের কারণঃ কোলেটোট্রিকাম গ্লোওস্পোরোয়ডিস (Colletotrichum gloeosporioides) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

এ রোগটি প্রধানত গ্রীষ্মকালে হয়ে থাকে। শুষ্ক আবহাওয়ায় এ রোগের আক্রমণ বেশী দেখা দেয়।

রোগের লক্ষণ

  •              প্রথমে পুরুষ ফুলে কালো বা বাদামী দাগের সৃষ্টি হয়, সেখান থেকে গোটা মুকুলে আক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।
  •              রোগের আক্রমণে আক্রান্ত মোচার গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত হলুদ হয়ে যায়।
  •              পরবর্তীতে গাঢ় বাদামী রং ধারণ করে।
  •              পূরো মোচাটি শুকিয়ে যায়।
  •              আক্রান্ত মোচার কুড়িগুলো সহজেই ঝরে পড়ে।
  •              ফল ধারণ একেবারে কমে যায়।
  •              রোগের আক্রমণে গাছের ফলন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

রোগের প্রতিকার

  •              আক্রান্ত গাছের মোচা কেটে পুড়ে ফেলতে হবে।
  •              মুকুল বের হওয়ার সময় প্রোপিকোনাজোল গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-টিল্ট ২৫০ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে একবার এবং এর ২০ দিন পর আর একবার মোট ২ বার ¯েপ্র করলে গুটি ঝরা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
  •              গাছে পর্যাপ্ত কাঠ পোড়ানো ছাই/পটাশ সার ব্যবহার করেও ভাল ফল পাওয়া যায়।

৪। রোগের নামঃ কুঁড়ি পচা (Bud rot ) রোগ

রোগের কারণঃ ফাইটোফথোরা পালমিভোরা (Phytophthora palmivora) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

রোগের লক্ষণঃ

  •              রোগের আক্রমণে প্রথমে কুড়ি এবং কেন্দ্রস্থ পাতায় পচন দাগ দেখা দেয়।
  •              ক্রমান্বয়ে কেন্দ্রস্থ কোষে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত কুড়িটিকে মেরে ফেলে।
  •              অনেক সময় প্রথমে পাতায় বাদামী দাগের সৃষ্টি হয়।
  •              সেখান থেকে রোগ কেন্দ্রস্থ কুঁড়িতে ছড়িয়ে পড়ে।
  •              অনুকুল আবহাওয়ায় রোগের তীব্রতা বাড়তে থাকে এতে গাছের কুঁড়ি মারা যায় ও ঝরে পড়ে।
  •              আক্রমণ বেশী হলে শেষ পর্যন্ত গাছটি মারা যেতে পারে।

রোগের প্রতিকার ঃ

  •              মৃত গাছ, ফলপচা রোগে আক্রান্ত মোচা ও ফল সরিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে।
  •              আক্রমণের প্রাথমিক অবস্থায় রোগ সনাক্ত করা সম্ভব হলে রোগাক্রান্ত স্থান কেটে ফেলে বোর্দো পেষ্টের (প্রতি লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম তুতে ও ১০০ গ্রাম চুন) প্রলেপ দিতে হবে।
  •              রোগ যাতে ছড়াতে না পারে সেজন্য রোগাক্রান্ত গাছসহ আশে-পাশের গাছগুলোতেও নিয়মিত বোর্দো মিক্সচার (প্রতি লিটার পানিতে ১০ গ্রাম তুতে ও ১০ গ্রাম চুন) অথবা মেটালে´িল + মেনকোজেব  গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-রিডোমিল গোল্ড) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর গাছের আগায় পাতাসহ স্প্রে করতে হবে।
  •              রোগ দমন সম্ভব না হলে আক্রান্ত গাছের মুকুট (ক্রাউন) কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
  •              রাইনোসোরাস বিটল দমন করতে হবে।

————————————–

লেখকঃ

উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব), মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, শিবগঞ্জ, বগুড়া, বাংলাদেশ।

মোবাইলঃ ০১৯১১-৭৬২৯৭৮

ই-মেইলঃ zaman.path@gmail.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare