সৃষ্টিকূলের জন্য পানি সরবরাহ ও বিতরণে আল্লাহর ব্যবস্থা

ড. মো. আবু বকর*

পানি কৃষি ব্যবস্থাপনায় একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। পানি ব্যতীত কোন জীবন কল্পনাও করা যায় না। আর কৃষি যেহেতু জীবন্ত গাছ গাছালী, ফল ফলাদী এবং ফুল ও ফসলাদীরই আয়োজন তাই কৃষিতে পানির গুরুত্ব অপরিসীম। বলা হয়ে থাকে পানির অপর নাম “জীবন”। কারণ পানি ব্যতীত কোন জীবনের অস্তিত্ব নেই। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে আমরা জানি যে প্রতিটি জীবের শরীর গঠিত হয় অসংখ্য “সেল” বা কোষ দ্বারা। প্রতিটি কোষে রয়েছে “প্রটোপ্লাজম” যার মূল ও বেশীর ভাগ অংশই হচ্ছে তরল যাতে রয়েছে পানি। এই কোষ গুলো থেকে যদি জলীয়ভাগটা সরিয়ে ফেলা হয় তা হলে ঐ গাছটি কখনও জীবিত থাকবে না। আমরা যখন কোন টবে একটি গাছ লাগাই তখন টবের মাটিতে নিয়মিত ভাবে পানি সরবরাহ করতে হয়। পানির অভাব হলেই প্রাথমিক ভাবে গাছটি নেতিয়ে পড়ে এবং পানির এ স্বল্পতা অল্প সময়ের জন্য হলে তা পুনরায় সরবরাহ করার সাথে সাথে কিছুক্ষণের মধ্যেই তা আবার সতেজ হয়ে উঠে। তবে দীর্ঘস্থায়ী পানির স্বল্পতার কারণে নেতিয়ে পড়া গাছ আর কখনও সতেজ হয়ে জীবন্তাবস্থায় ফিরে আসেনা। কাজেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই কৃষিতে পানির প্রয়োজনীয়তার কথা সুস্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করা যায়। এত গুরুত্বপূর্ণ এই কৃষির উপকরণটির খোদা তায়ালার সৃষ্টি এ পৃথিবীতে কি ভাবে ব্যবস্থাপনা হচ্ছে কোরানুল কারীমের সৃষ্টিতে আমরা তা আলোচনার প্রয়াস পাবো।

প্রথমত ঃ এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট এ পৃথিবী জল ভাগের তুলনায় স্থলভাগ খুবই কম যা এক চতুর্থাংশ হবে বলে মনে করা হয়। বিপুল পরিমাণ থাকলেও সাধারণভাবে পৃথিবীর বিশাল আকারের সমুদ্রে অবস্থিত এ পানি সকল প্রকার গাছ পালা ও মানুষের পক্ষে ব্যবহারোপযোগী নয়। কারণ ঐ পানি হচ্ছে লোনা পানি অর্থাৎ প্রচুর লবণ যুক্ত পানি। মানুষ এবং গাছ  গাছালী কেউ তা সরাসরি ব্যবহার করতে পারে না। তাই ব্যবহারোপযোগী পানি সরবরাহের ব্যবস্থা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই করেছেন। এ প্রসংগে আল্লাহ তায়ালা কোরানুল কারীমে উল্লেখ করেছেন “আল্লাজী যা’য়ালা লাকুমুল আরদ্ধা ফিরাশাউ ওয়াস্ সামায়া বিনা আ, ওয়া আনঞ্জালা মিনাস্ সামায়ি মা আন্ ফাআখ্রাজা বিহি মিনাস্ সামারাতি রিজকাল্ লাকুম ফালা তাজ’য়ালু লিল্লাহি আন্দা দাও ওয়া আন্তুম তা’লামুন। (সুরা আল বাকারা আয়াত-২২)

অর্থাৎ তিনিই সেই মহান সত্ত্বা, যিনি যমীনকে তোমাদের জন্য শয্যা স্বরূপ স্থাপন করলেন, আর আসমানকে বানালেন ছাদ এবং আসমান থেকে (বৃষ্টির আকারে) পানি বর্ষিয়ে তার সাহায্যে নানা প্রকার ফল মূল উৎপাদন করে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করলেন অত:পর তোমরা জেনে বুঝে (এ সব বিষয়ে) আল্লাহ তায়ালার সাথে কাউকে শরীক করো না। অনুরূপ ভাবে কোরানুল কারীমে অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন।

“আম্মান খালাক্বাস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা ওয়া আনযালা লাকুম মিনাস্-সামায়ী মা আন; ফা আম্বাত্না বিহী হাদাইক্বা যাতা বাহ্যাহ, মা কানা লাকুম আন্তুমবিতূ শাজ্বারাহা, আ ইলাহুম মা’ আল্লাহ; বালহুম ক্বাওমুই ইয়া’দিলূন। আম্মান জ্বাআলাল আরদ্বা ক্বারারাওঁ ওয়াজ্বা’আলা খিলালাহা আনহারাওঁ ওয়া জ্বায়ালা লাহা রাওয়াসিয়া ওয়াজ্বা’য়ালা বাইনাল বাহ্রাইনি হাজ্বিযা; আ ইলাহুম মা’আল্লাহ বাল আকছারুহুম লা ইয়া’লামুন; আম্মাইঁ ইয়ুজ্বিবুল মুদ্দতাররা ইযা দা’আহু ওয়াইয়াক্ শিফুস্ সূআ ওয়াইয়াজ্ব’ আলুকুম খুলাফা আল আরদ্ধ; আ ইলাহুম মা’আল্লাহ; ক্বালীলাম মা তাযাক্কারুন। আম্মাই ইয়াহদীকুম ফী যুলুমাতিল বাররি ওয়াল বাহরি ওয়ামাই ইয়ূরছিলুর রিয়াহা বুশরাম বাইনা ইয়াদাই রাহমাতিহী; আ ইলাহুম মা’আল্লাহ; তা’য়ালা আ’ম্মা ইয়ূশরিকূন। আম্মাই ইয়াবদাউল খালক্বা ছুম্মা ইয়া ই’দুহূ ওয়ামাই ইয়ারজুক্কুকুম মিনাস সামায়ি ওয়াল আরদ্বি আ ইলাহুম মা’আল্লাহ কূল হাতু বোরহানা কুম ইন কুনতুম সোয়াদিকীন (সুরা আন নামল, আয়াত ৬০-৬৪)

(যারা আল্লাহ্র সাথে শরীক সাব্যস্ত করে তারা শ্রেষ্ঠ) না তিনিই (শ্রেষ্ঠ) যিনি আসমান সমূহ ও যমীন পয়দা করেছেন এবং আসমান থেকে তোমাদের জন্য (বৃষ্টির আকারে) পানি বর্ষণ করেছেন, (আবার) তা দিয়ে (যমীনে) মনোরম উদ্যান তৈরি করেছেন, অথচ তার (একটি ক্ষুদ্র) বৃক্ষ পয়দা করারও তোমাদের ক্ষমতা নেই; (বলো এ সব কাজে) আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্য কোন মাবুদ আছে কি? বরং তারা হচ্ছে এমন এক সম্প্রদায়, যারা অন্যকে আল্লাহ তায়ালার সমকক্ষ সাব্যস্ত করেছে। কিংবা তিনি (শ্রেষ্ঠ) যিনি যমীনকে (সৃষ্টিকূলের) বসবাসের উপযোগী করেছেন, (আবার) তার মাঝে মাঝে প্রবাহিত করেছেন অসংখ্য নদী নালা, (যমীনকে দৃঢ় করার জন্য) তার মধ্যে পর্বত মালা স্থাপন করেছেন, দুই সাগরের মাঝে (মিষ্টি ও লোনা পানির) সীমারেখা সৃষ্টি করে দিয়েছেন; (বলো, এসব কাজে)  আল্লাহ তায়ালার সাথে আর কোন মাবুদ আছে কি? কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোক (এ সত্যটুকু) জানে না; অথবা তিনিই (শ্রেষ্ঠ) যিনি কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির ডাকে সাড়া দেন, যখন (নিরূপায় হয়ে) সে তাঁকেই ডাকতে থাকে, তখন (তার) বিপদ আপদ তিনি দূরীভূত করে দেন এবং তিনি তোমাদের এ যমীনে তাঁর প্রতিনিধি বানান; (এ সব কাজে) আল্লাহ তায়ালার সাথে আর কোন মাবুদ কি আছে? (আসলে) তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো; কিংবা তিনি (শ্রেষ্ঠ) যিনি তোমাদেরকে জলে স্থলের (গহীন) অন্ধকারে পথ দেখান, যিনি তাঁর অনুগ্রহ-সম (বৃষ্টি) বর্ষণের আগে তার সুসংবাদ বহন করার জন্য বাতাস প্রেরণ করেন; (এ সব কাজে) আল্লাহর সাথে অন্য কোন মাবুদ আছে কি? আল্লাহ তায়ালা অতীব মহান, ওরা যা কিছু তাঁর সাথে শরীক করে তিনি তা থেকে অনেক উর্দ্ধে; অথবা তিনি (শ্রেষ্ঠ) যিনি (গোটা) সৃষ্টিকে (প্রথমবার) অস্তিত্বে আনায়ন করেছেন এবং (মৃত্যুর পর) তা পূনর্বার সৃষ্টি করবেন, কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রেযেক সরবরাহ করছেন? আছে কি অন্য কোন মাবুদ আল্লাহ সাথে (এ সব কাজে)? তাদেরকে তুমি বলো (হে নবী), যদি তোমরা (তোমাদের দাবীতে) সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে (তার স্বপক্ষে) তোমাদের প্রমাণ পেশ করো। কোরানুল কারীমের সুরা বাকারার উদ্বৃত আয়াতটিতে আল্লাহ তায়ালা যে সকল বিষয়ের প্রিিত ইংগীত দিয়েছেন তার প্রথমটি হচ্ছে তাঁর সৃষ্টির বিরাটত্ব। তাঁর সৃষ্টি এ মহা বিশ্বের ব্যাপ্তী কত বিশাল তার একটা সোজা সাপটা ও সহজ ধারণা প্রদানের জন্য বলা হল যে পৃথিবীকে বানানো হয়েছে মানুষের শস্যা স্বরূপ আর আকাশকে বানানো হয়েছে সে শয্যারই ছাদ হিসাবে। বলা বাহুল্য আল্লাহ তায়ালা সাত স্তবক আকাশ সৃষ্টি করেছেন যা স্তরে স্তরে সাজানো আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন “আল্লাজী খালাক্বা সাবাআ সামাওয়াতিন তিবাক্বাঃ (সুরা মূলক, আয়াত -৩) অর্থাৎ তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি সাতটি আকাশ সৃষ্টি করে স্তরে স্তরে সাজিয়ে রেখেছেন। এই সাতটি আকাশের মধ্যে সব চেয়ে নিকটে হলো পৃথিবীকে ঘিরে রাখা প্রথম আকাশটি যাকে বলে পৃথিবীর আকাশ বা “সামায়াদ্দুনীয়া,” সূরা মূলক এ বলা হয়েছে, “ওয়ালাক্বাদ যাইয়্যান্নাস্ সামায়াদ্দুনীয়া বিমাসাবিহা” (সুরা মূলক, আয়াত-৫) অর্থাৎ আমরা দুনিয়ার আকাশকে বিভিন্ন তারকারাজি দ্বারা সজ্জিত করেছি।

তারকাখচিত যে আকাশকে আমরা দেখতে পাই তা পৃথিবী থেকে কত দুরে তার সঠিক হিসাব মানুষের পক্ষে জানা আজও সম্ভব হয়নি। তবে মানুষ যা জানতে পেরেছে তা হচ্ছে এই যে সূর্য হচ্ছে একটি নক্ষত্র যাকে ঘিরে নয়টি গ্রহ আবর্তিত হচ্ছে। পৃথিবী তাদের মধ্যে একটি গ্রহ। সূর্য থেকে দূরত্বে অবস্থানের দিক থেকে বুধ এবং শুক্রের পরেই পৃথিবীর অবস্থান। এই তৃতীয় অবস্থানে থেকে পৃথিবী সূর্য থেকে নয় কোটি ত্রিশ লক্ষ মাইল দূরে আছে। সূর্যের পরিবারে আরও ছয়টি গ্রহ আছে ঐ গ্রহ গুলো থেকে সূর্যের সঠিক দুরত্ব কত তাও মানুষের কাছে অজানাই রয়ে গেছে। এমনি ভাবে সূর্যের মত আরও অসংখ্য নক্ষত্র রয়েছে যা এ পৃথিবীর অর্থাৎ প্রথম আকাশের সীমার ভিতরেই রয়েছে। কাজেই আকাশকে যে পৃথিবীর ছাদ স্বরূপ বানানো হয়েছে সে আকাশের সীমা রেখা কত বিস্তৃত তা উল্লিখিত তথ্যাবলী থেকে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে। কাজেই আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি আকাশ ও পৃথিবী তাঁর সৃষ্ট মহাবিশ্বের তুলনায় খুবই ছোট।

সুরা বাকারার উদ্ধৃত আয়াতটিতে অত:পর আল্লাহ তায়ালা বললেন আকাশ থেকে পানি বর্ষিয়ে তিনি মানুষের জন্য ফলমূল উৎপাদন করে মানুষের রিযিকের ব্যবস্থা করেন। এখানে আকাশ থেকে বলতে বুঝায় মানুষের মাথার উপরে যা দেখা যায় তা থেকে কারণ আকাশ কতদূরে তার কোন হিসাব মানুষের জানা নেই। এ জন্য মাথার উপরে আমরা যখন চাঁদ দেখি আমরা তখন বলি আকাশে চাঁদ উঠেছে। ঠিক তেমনি আমরা ঘন কালো মেঘ দেখে বলে উঠি আকাশে মেঘ করেছে। মাথার উপর অবস্থিত মেঘ আসলে কি? এটা আর কিছু নয় পৃথিবী পৃষ্ঠের জলাশয়ে থাকা পানিরই বাষ্পীভূত অবস্থা। সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত পানি পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে উপরে যেয়ে কিছুটা ঘনীভূত হয়ে মেঘের আকার ধারণ করে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে ভেসে বেড়ায়। এ মেঘ আরও ঘনীভূত হয়ে তবেই বৃষ্টির সৃষ্টি হয়। মানুষ তার প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ বৃষ্টিপাত ঘটাতে সক্ষম নয়। বৃষ্টিপাত ঘটানো একান্তই এবং নিরঙ্কুষ ভাবে আল্লাহ তায়ালার এখতিয়ার। এ বৃষ্টিপাত ব্যতীত মিঠাপানি পাওয়ার অন্য যে সকল উৎস আছে তা হলো নদী বা ঝরণার পানি। সূর্যের তাপে পৃথিবী পৃষ্ঠের বিশাল জলাশয় নদী-নালা, খাল-বিল, সাগর-মহাসগরের পানি বাষ্পীভূত হয়ে মেঘের আকারে ভেসে যেতে যেতে পৃথিবীতে স্থাপিত পর্বত মালার গায়ে বাধা প্রাপ্ত হয়ে তা বরফের আকারে জমা হয়ে থাকে। এ বরফ দিনের সূর্য তাপে গলে গলে ঝর্নার আকারে পাহাড়ের বুক চিরে সমতল ভূমিতে নেমে আসে। (চলবে)

————————————–

*লেখকঃ চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রকল্প পরিচালক (অবসর প্রাপ্ত), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare