সৃষ্টিকূলের জন্য পানি সরবরাহ ও বিতরণে আল্লাহর ব্যবস্থা

ড. মো. আবু বকর*

পূর্ব প্রকাশের পর

সুরা আল বাকারার ২২ নং আয়াতটিতে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী ও আকাশকে ফরাশ এবং চাদোয়া হিসাবে সৃষ্টি করে এতদুভয়ের মধ্যে অবস্থিত পৃথিবী নামক গ্রহের অধিবাসী মানুষের জীবনযাপনের লক্ষ্যে মানুষের রিজিক এর ব্যবস্থা করার জন্য পৃথিবীর মাটি থেকে কিরূপে শস্য ও ফসলাদির ব্যবস্থা করেছেন তারই ইঙ্গিত প্রদান করে বলেছেন যে তিনি এতদ সংক্রান্ত কাজে আকাশ থেকে পানি বর্ষিয়েছেন। এ পানি বর্ষনের ব্যবস্থাটি তিনি কিরূপে সংস্থাপন করেছেন তার যৎকিঞ্চিত ব্যবস্থার উপর পূর্ববর্তী সংখ্যায় আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান আলোচনায় পূর্বে উদ্ধৃত সূরা আন নমলের ৬০-৬৪ পর্যন্ত পাঁচটি আয়াতে আল­াহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশনা আলোচনা করা হচ্ছে। ৬০ নং আয়াতটিতে আল­াহ তায়ালা তাঁর ক্ষমতার সাথে যারা অংশীদার সাব্যস্ত করে তাদের সামনে অত্যান্ত যুক্তিপূর্ন ভাবে এ কথাটি পেশ করেছেন যে মানুষ কি করে আল­াহ তায়ালার সাথে অন্য শরীক সাব্যস্ত করে বা তার সমকক্ষ অন্য কোন শক্তি আছে বলে মনে করে অথচ আল­াহই হচ্ছেন এ বিশাল বিস্তৃত আকাশ ও যমিনের স্রষ্টা। এ যমিনে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। মানুষের রিযিক প্রদানের জন্য তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টির মাধ্যমে পানি বর্ষণ করেছেন। এ পানিই হচ্ছে জীবনের আঁধার। ইহা ব্যতীত কোন জীবন কল্পনা করা যায়না। এ পানি প্রাণহীন মরু প্রান্তরে ঘটায় জীবনের সমারোহ। যমীনে সৃষ্টি হয় সবুজ শ্যামল বাগ বাগিচা তরুবীথি সুশোভিত বনরাজি, মাঠে ময়দানে উদগত হয় মানুষ ও জীবজšুÍর রিযিকের যোগানদানের জন্য রকম বেরকম ফসলাদি, সৃষ্টি হয় ফলফলাদি সুশোভিত মনোরম উদ্যান। এ সকল কিছুর স্্রষ্টা হচ্ছেন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল­াহ তায়ালা। মানুষ কিংবা অন্য কোন সত্ত¡া এ সৃষ্টির সামান্যতম অংশীদারও হতে পারে না, এমনকি একটি ক্ষুদ্রতম বৃক্ষও সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। তা হলে আল­াহ তায়ালার মোকাবিলায় কি করে মানুষ সৃষ্টি ও ব্যবস্থাপনায় আল­াহর শরীক বা অংশীদার সাব্যস্ত করার প্রয়াস পেয়েছে। মানুষের কাছে উপস্থাপনের যোগ্য সামান্য তম যুক্তিও নেই।

মহান আল­াহ তায়ালা শুধুমাত্র সৃষ্টি কর্তাই নন, তিনি সমগ্র সৃষ্টির লালন পালন ও সকল ব্যবস্থাপনারও দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ফলে সৃষ্টির সেরা মানুষ তার জীবন যাপন ও পরিচালনায় আল­াহ তায়ালার পক্ষ থেকেই নির্দেশনা ও নিরাপত্তা লাভে ধন্য হয়েছে। মানুষের যুক্তি সংগত সকল চাহিদা ও অভাব অভিযোগ তিনিই পূরণ করেন। সৃষ্টির পর বেঁচে থাকার জন্য মানুষের যেটা আশু প্রয়োজন তা হল তার বাসোপযোগী আবহাওয়া ও পরিবেশ। সকল সৃষ্টির মহা প্রভূ আল­াহ তায়ালা তাই যমিনকে মানুষের জন্য বাসোপযোগী করে সাজিয়েছেন। সূরা আন   নমলের ৬১ নং আয়াতটিতে আল­াহ তায়ালা মানুষের সামনে স্পষ্ট করে উপস্থাপন করেছেন তিনিই এ যমিনকে স্থিতি ও বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন। এরশাদ হচ্ছে ”অম্মান জ্বায়ালাল আরদা ক্বারারাঁও ওয়াজ্বা’আলা খিলালাহা আনহারাঁও ওয়া জ্বায়ালা লাহা রাওয়াসিয়া ওয়াজ্বা’য়ালা বাইনাল বাহরাইনি হাজ্বিযা; আ ইলাহুম মা’আল­াহ, বাল আক্ছারুহুম লা ইয়া’লামুন”। অর্থাৎ তিনিই কি অধিক ক্ষমতাবান নন যিনি যমীনকে (সৃষ্টিকুলের) বসবাসের উপযোগী করেছেন, (এতদুদ্দেশ্যে) তার মাঝে মাঝে প্রবাহিত করেছেন অসংখ্য নদীনালা, (যমীনকে দৃঢ় ও স্থিতি প্রদানের জন্য) তার মধ্যে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, দুই সাাগরের মাঝে (মিষ্টি ও লোনা পানির ধারা পৃথক রাখার জন্য) আড়াল সৃষ্টি করে দিয়েছেন, (হে মানুষ এ সকল কাজে) আল­াহ তায়ালার সাথে শরীক আরও কোন মাবুদ আছে কি? (নাই) বরং ইহাদের অধিকাংশ লোকই অজ্ঞতা ও মূর্খ্যতায় নিমজ্জিত রয়েছে। কোরআনুল কারীমের এ আয়াতটিতে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর যমীনকে বসবাসের উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে তিনটি পৃথক পৃথক পদক্ষেপ এর বিষয়ে উলে­খ করেছেন। প্রথমত: পৃথিবীর বুক চিড়ে অগণিত নদীনালা প্রবাহিত করণ। ইতোপূর্বে আমরা উলে­খ করেছি যে পৃথিবীপৃষ্ঠে অবস্থিত সাগর মহাসাগর নদ নদী খাল বিলের পানি সূর্য্যরে তাপে বাস্পীভূত হয়ে বায়ুমন্ডলে উঠে যে মেঘের সৃষ্টি হয় তা ভেসে যেতে যেতে পর্বত চুড়ায় বাধা প্রাপ্ত হয়ে বরফের আকারে জমা হতে থাকে অথবা কিছু বৃষ্টির আকারে পর্বতের চুড়া বেয়ে গড়িয়ে চলতে চলতে সৃষ্টি হয় ঝর্ণার, আর এ ঝর্ণার সমূহে মিলিত স্্েরাত সমতল ভূমির উপর দিয়ে চলতে যেয়ে সৃষ্টি হয় নদ নদীর। এ নদী প্রবাহের মাধ্যমে মিঠা পানি সমুদ্রে যেয়ে মিলিত হয়।  আর এ নদ নদী পৃথিবী পৃষ্ঠে দিয়ে চলার পথে দুক‚লের পরিবেশের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে, দুক‚লের জমির ফসলে সেচের পানি সরবরাহের উৎস হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্ষায় অধিক পানি প্রবাহের সময় নদীর দুক‚ল পা­বিত করে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। নদী প্রবাহের ফলে নদীর দুক‚লে সৃষ্টি হচ্ছে গাছপালা তরুলতা ফুল ও ফসলের সমারোহ, ধীরে ধীরে উদ্ভব হচ্ছে সবুজ শ্যামল বনানীর, যা মানুষসহ সকল প্রকার জীবজন্তুুর বসবাসের জন্য যথাযথ অবদান রেখে চলেছে। মানুষের খাদ্যের জন্য যেমনি করে ফসল শস্য ও ফল ফলাদি উৎপাদনে সহায়ক হচ্ছে তেমনি জীবজন্তুর খাদ্যেরও সংস্থান হচ্ছে পাশাপাশি। দ্বিতীয়ত: যে বিষয়টির দিকে উদ্ধৃত আয়াত টিতে ইংগীত করা হয়েছে তা হলো পৃথিবী পৃষ্ঠে পাহাড় পর্বত স্থাপন। পৃথিবী পৃষ্ঠে স্থল ভাগের তুলনায় জলভাগ অধিক হওয়ার কারনে স্থলভাগটি জলভাগে ডুবে যাওয়ার কিংবা অন্তত:পক্ষে জলভাগের উপর দোলতে থাকার কথা, যদি পৃথিবী এ প্রভাবে দোল খেতে থাকতো তাহলে তাতে মানুষ ও অন্যান্য সকল প্রাণীর বসবাসের যোগ্য হতে পারতো না। কখনও কখনও ভূকম্পনের ফলে পৃখিবী যে ভাবে দোলে ওঠে এবং অধিক মাত্রার ভূকম্পনের ফলে যে পরিমাণ জানমালের ক্ষতি সাধিত হয় পৃথিবীর দোলন মাত্রা সে পরিমাণ হলে পৃথিবীতে কোন প্রাণী বসবাস করতে পারতো না। পৃথিবীর স্থলভাগ অল্প হওয়া সত্বেও যাতে জলভাগের উপর তা দোলতে না পারে সে জন্যই আল­াহ তায়ালা স্থলভাগে সুউচ্চ পর্বত সমূহকে স্থাপন করেছেন। কোরআনুল কারীমে সুরা’আননাবা’ আল­াহ তায়ালা বলেন “ওয়াল জিবালা আওতাদা”(আয়াত নং-৭) অর্থাৎ পাহাড় পর্বতগুলোকে আমি পেরেকের মতো গেড়ে দিয়েছি। ফলে পৃথিবী দোলতে পারে না বরং একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পৃথিবী নামক এ গোলকটি মহাশূন্য লোকে ঝুলানো রূপে রয়েছে। ইহা কোন কিছুর উপর ঠেস লাগানো নয়। তা সত্বেও এ ঝুলন্ত পৃথিবীতে কোনই কম্পন অনুভূত হয় না। ইহা পর্বতসমূহ স্থাপনের ফল। শুধু এটুকুই নয় ঝুলন্ত এ পৃথিবী নিয়মিত আবর্তিত হচ্ছে। ফলে পৃথিবীপৃষ্ঠে দিন ও রাত্রি সংঘটিত হচ্ছে। পৃথিবীর এক পৃষ্ঠ সূর্য্য রশ্মি এর মুখোমুখী হচ্ছে আবার ক্রমান্বয়ে এ অংশটি সূর্য্য রশ্মি থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। এ ব্যবস্থাটি না হলে পৃথিবী পৃষ্ঠের যে দিকে সূর্য্য রশ্মি আপতিত হতো সেখানে হতো তীব্র গরম, তাতে হয়তো উক্ত পৃষ্ঠের জলাধারগুলো শুকিয়ে যেতো ক্রমাগত বাস্পীভবনের ফলে। পক্ষান্তরে পৃথিবীর বিপরীত পৃষ্ঠে হতো অন্ধকার এবং ক্রমাগত অন্ধকারে থাকার কারনে  কোন গাছপালা বা অন্তত:পক্ষে সবুজ গাছপালা জন্মানো সম্ভব হতো না। ফলে সেই পরিবেশে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য প্রয়োজনীয় অক্্িরজেন এর সঠিক সর্বরাহ পাওয়া যেত না যা সবুজ বনানী ঘেরা পরিবেশে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়াও ক্রমাগত ভাবে অন্ধকারে থাকার ফলে তাপের উৎস থেকে বঞ্চিত পৃষ্ঠটি হয়ে যেতো প্রবল ঠান্ডা যেখানে মানুষসহ অন্যন্য প্রাণীক‚লের বসবাস হয়ে যেতো প্রায় অসম্ভব।

অপর একটি বিষয় প্রণিধান যোগ্য যে গোলাকৃতির এ পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে প্রায় পাঁচশত মাইল উঁচু বায়ুর এক সূ² গাঢ় স্তর যা এ পৃথিবীকে মারাত্মক উল্কা পতনের আঘাত হতে বাঁচিয়ে রেখেছে। প্রতিদিন যে প্রায় দুই কোটি উল্কা প্রতি সেকেন্ডে ত্রিশ মাইল গতিবেগে আপতিত হচ্ছে তার গতি এ বায়ুস্তর এর কারনে না কমে গেলে পৃথিবীপৃষ্ঠে এমন সর্বনাশা ধ্বংস লীলার সৃষ্টি হতো যার ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠে কোন মানুষ জীবজন্তু বা বৃক্ষলতা জন্মাতে অথবা জীবন্ত থাকতে পারতো না।

এ বায়ুর আস্তরণই পৃথিবী পৃষ্ঠের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রন করে। সাগর মহা-সাগরসহ পৃথিবীর জলাধার গুলো থেকে বাস্পীভূত হয়ে মেঘমালার সৃষ্টিমূলেও এ বাতাস। বাতাসই মেঘমালাকে যমীনের বিভিন্ন দিকে ও অংশে চালিয়ে নিয়ে বৃষ্টি বর্ষণের কারণ ঘটিয়ে থাকে। এ বিষয়টির প্রতি ইংগীত করে কোরআনুল কারীমে আল­াহ তায়ালা এরশাদ করেন, “ওয়াহুয়াল­াজি ইয়ুরাসলু রিয়াহা বুশরাম বাইনা ইয়াদাই রাহমাতিহি হাত্তা ইয়াআক্বাল­াত সাহাবান সিক্বালান সুক্বনাহু লিবালাদিম মাইয়্যিতিন ফাআন্যালনা বিহিল মাআ ফাআখ্রাজ্না বিহী মিন্ কুলি­ছ ছামারাত: কাযালিকা নুখরিজুল মাউতা লা’আল­াকুম তাযাক্কারূন” (সূরা আল আরাফ আয়াতনং-৫৭)

অর্থাৎ আর আল­াহ তায়ালাই বায়ুকে নিজের অনুগ্রহের আগে সুসংবাদবাহী রূপে পাঠান। তারপর সে বাতাস যখন পানি ভরা মেঘ বহন করে তখন কোন নির্জীব ভূখন্ডের দিকে তাকে চালিয়ে দেন এবং সেখানে বারি বর্ষণ করে (সে ভূখন্ড থেকে) নানা প্রকার ফসলাদি উদগত করান। দেখো, এ ভাবে আমি মৃতদেরকে মৃত্যুর অবস্থা থেকে বের করে আনি। হয়তো এ চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ থেকে তোমারা শিক্ষাগ্রহণ করবে। কাজেই আল­াহ তায়ালার এ ঘোষনা থেকে বৃষ্টিপাত ঘটানোর ক্ষেত্রে বাতাসের ভূমিকা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারা যাচ্ছে। পৃথিবীর এ যমীনকে বাসোপযোগী করার জন্য যে সকল কার্যকারনের মিলিত প্রচেষ্টায় তা মানুষ ও অন্যান্য অনেক প্রাণীর বসবাসের যোগ্য হয়েছে তার মাত্র কয়েকটি বিষয়ের আলোচনাই এখানে স্থান পেয়েছে। কোন বুদ্ধিমান মানুষ এ সকল সূ² বিষয়গুলো সামনে রেখে যদি যথাযথভাবে চিন্তা করে তাহলে তিনি অবশ্যই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে এ বিশাল সৃষ্টিলোক যা অত্যন্ত সুশৃংখল ও সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা স্বত:ই কায়েম হতে এবং পরিকল্পিত হতে পারে না। তৈরী হতে পারে না কোন মহাজ্ঞানীর মৌলিক পরিকল্পনা ব্যতীত; কিংবা এ ধারণাও করতে পারে না যে এ মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও বিন্যাসের এ বিরাট সুসামঞ্জস্যপূর্ন ও সৃজনশীল এ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে এক মহাপরিকল্পনাকারী আল­াহ তায়ালা ব্যতীত অন্যকোন সত্ত¡ার বিন্দু পরিমাণও কর্তৃত্ব রয়েছে। (চলবে)

————————————-

*লেখকঃ

চীফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রকল্প পরিচালক (অবসর প্রাপ্ত), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট জয়দেবপুর, গাজীপুর।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *