সোনালী আঁশের  নতুন উদ্ভাবন ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে

 

নিতাই চন্দ্র রায়

পাট কাটা, পাট জাগ ও পাট শুকানোর কাজে ব্যস্ত এখন সারা দেশের কৃষক।  এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাট জাগ নিয়ে কৃষককে কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়নি। সবেমাত্র  নতুন পাট বাজারে আসতে শুরু করেছে। প্রতি মন পাট দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দামে। গত বছর প্রতিমন পাটের দাম ছিল ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। ন্যায্য মূল্য পাওয়ার কারণে, এবছর রাজশাহী অঞ্চলে বেড়েছে পাটের আবাদ।  ২০১৩-১৪ মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে ৩৭ হাজার ৮৮৯ হেক্টর জমিতে হয়েছিল পাটের আবাদ। চার বছর ব্যবধানে চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলা- রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁও ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে  পাটের আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ১৫০ হেক্টর। পাটের আবাদ বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য মতে, ২০১৩-১৪ মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলায়  পাট উৎপাদন হয়েছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৬৭৯ বেল। কৃষকেরা ভাল দাম না পাওয়ায় পরের বছরই কমে যায় পাটের আবাদ। তারপর ২০১৫- ১৬ মৌসুমে পাটের দাম বেশি পাওয়ায়  চলতি ২০১৬ -১৭ মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে ১০ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে পাটের চাষ হয়। চলতি মৌসুমে এই অঞ্চলে ৫ লাখ ৭ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কৃষকও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজশাহী বিভাগে এবছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি পাট উৎপাদিত হবে। এক সময় রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলিতে অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রচুর আখের চাষ হতো। রোপণ থেকে মাড়াই পর্যন্ত ১৪ থেকে ১৫ মাস সময় লাগা, উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং  চাষিদের  প্রত্যাশা অনুযায়ী আখের মূল্য বৃদ্ধি না করার কারণে  কৃষক আখ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং ঝুঁকে পড়েন পাট চাষের দিকে। সোনালি আঁশ দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল হওয়া সত্ত্বেও ধান-চালের মতো এই ফসলের দাম সরকার নির্ধারণ করে দেয় না। ফলে এক শ্রেণির দালাল, ফরিয়া ও  মধ্যসত্ত্বভোগীরাই নিয়ন্ত্রণ করে পাটের বাজার। বাজারে পাটের সরবরাহ একটু বাড়লে কমে যায় পণ্যটির দাম। আবার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের পাট বিক্রির  সাথে সাথেই বেড়ে যায় পাটের দাম। অনেক সময় পাটকলগুলি চলতি মূলধনের অভাবেও সময় মতো পাট ক্রয় শুরু করতে পারেনা। এ জন্য কৃষক পাটের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। অতীতে পাটের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে পাটের স্তুপে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ করার অনেক ঘটনাও ঘটেছে এই দেশে।

কৃষকের কথা এ বিঘা জমির পাট কাটতে শ্রমিকের মজুরি দিতে হয় ৪ হাজার টাকা। পাটের আঁশ ছাড়ানোর জন্য একজন শ্রমিককে মজুরি দিতে হয় ৪০০ টাকা ও এক বেলা খাবার। গত বছর এই মজুরি ছিল ৩০০ টাকা। প্রতি বছর  উৎপাদন উপকরণ ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেভাবে কিন্তু বাড়ছে না পাটের দাম।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের পাট চাষি মুকুল, মকছেদ আলী, রশিদুল ইসলাম, জাকির ও রমিজ উদ্দিনের সাথে কথা বলে জানা যায় প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষে বীজ, হালচাষ, নিড়ানী, পাট কাটা ও ধোয়া বাবদ খরচ হচ্ছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। পাটের ফলন হয়েছে বিঘা প্রতি ১২ থেকে ১৩ মন। বর্তমানে বাজারে প্রতি মন পাট বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এতে বিঘাপ্রতি লাভ হচ্ছে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা। এতে চাষিরা মোটামুটি খুশী। তবে অনেকের আশঙ্কা – শেষ পর্যন্ত পাটের এই দাম অব্যাহত থাকে কি না।  অনেক কৃষক সংসারের সারা বছরের জ্বালানির জন্যও পাটের চাষ করেন। অপর দিকে পাটের পাতা পড়ে ও পচে  কৃষি জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে।

পাটের জীবন রহস্য উন্মোচনের প্রায় সাত বছরের মাথায় জিন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে রবি-১ নামে পাটের একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন মাকসুদুল আলমের অনুসারীরা। শুধু উদ্ভাবনই নয়; পাট গবেষণা কেন্দ্রের মাঠে ও কৃষকের জমিতে এটি চাষ করে  আশানুরুপ সফলতাও পাওয়া গেছে। নতুন উদ্ভাবিত রবি-১ জাতের তোষা পাটের জাত থেকে কমপক্ষে  ২০ শতাংশ  বেশি ফলন পাওয়া গেছে। জাতটির উচ্চতা সাধারণ জাতের চেয়ে ২০ সেন্টিমিটার বেশি। জাতটির জীবনকাল ১০০ দিন, যেখানে সাধারণ তোষা পাটের জীবন কাল ১২০ দিন। এতে কৃষক এই  জাতের পাট কেটে উচ্চ ফলনশীল জাতের আমন ধানের চাষ করতে পারবেন অনায়াসে। এই জাতের পাটের আঁশের উজ্জ্বলতা বেশি। তাই বেশি দাম পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। পাটের আঁশের মান  নির্ভর করে লিগনিনের পরিমাণের ওপর। লিগলিন কম হলে আঁশের মান ভাল হয়। এজাতের জাতের পাটে লিগনিনের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম। পাটের এই নতুন জাত নিয়ে বিশ্ব বিখ্যাত জার্নাল‘নেচারে’ গত জানুয়ারি মাসে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় । এতে বলা হয়েছে- প্রচলিত তোষা পাটের জিন কাঠামোর সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে এই জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এটি তোষা পাটের চেয়ে গুণে ও মানে ভাল। ২০১০ ও ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশী বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী তোষা ও দেশী পাটের জীবন রহস্য উন্মোচন করেন।

গুণগতমানের বীজের অভাব বাংলাদেশে পাট চাষের একটি মৌলিক সমস্যা। এজন্য কৃষকদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক সময় ভেজাল বীজ ব্যবহারের কারণে অসময়ে ছোট গাছে ফুল আসে। এতে পাটের ফলন মারাত্মক ভাবে হ্রাস পায় এবং কৃষক চরম ক্ষতির শিকার হন। বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটের শতকরা ৮৫ ভাগ আসে তোষা জাত থেকে। আবার তোষা জাতের জন্য প্রয়োজনীয় বীজের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ আমদানি করতে হয় ভারত থেকে। ভারত থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার টন তোষা জাতের পাট বীজ আমদানি করতে হয়।  কৃষক পর্যায়ে এই বীজ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি  করা হয়।  রবি-১ জাতের পাটের বীজ কৃষক নিজেরা উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট  বিজ্ঞানীরা।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ত জমিতে বিজেআরআই উদ্ভাবিত দেশীপাট- ৮ জাতের বাম্পার ফলন হয়েছে এবার। লবণাক্ততার কারণে বছরের পর বছর পরিত্যক্ত থাকা ওই সব জমিতে পাট চাষকরে চাষিরাও  খুব খুশী। বিজেআরআই উদ্ভাবিত লবণ সহিষ্ণু দেশীপাট-৮ এখন উপকূলীয় অঞ্চলের চাষিদের নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। স্বপ্ন দেখছেন এক ফসলী জমিতে দুটি ফসল আবাদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় সব জেলায়  এই পাট আবাদে সরকার কৃষকদের সহযোগিতায় এগিয়ে এলে উপকূলের অর্থনীতিতে পাট বিপ্লব সাধিত হবে, যা ওই অঞ্চলের কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে আরো স্বাবলম্বী করে তুলবে। দেশের উপকূলীয়  ১৮ টি জেলায় মোট কৃষি জমির পরিমাণ ২৮ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে চাষযোগ্য জমি ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ ৮ লাখ ৫৮ হাজার। চাষযোগ্য এই জমির মধ্যে ১০ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। দিন দিন ওই লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে এবং জমি হারাচ্ছে  তার  উৎপাদিকা শক্তি। ফলে প্রতি বছর খরিপ-১ মৌসুমে এই বিপুল পরিমাণ জমি পতিত থেকে যাচ্ছে। এই পতিত জমিতে গত দুই বছর ধরে  বিজেআরআই উদ্ভাবিত লবণ সহিষ্ণু দেশী পাট-৮ চাষে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে কৃষক। লবণ সহিষ্ণু আমন ধান চাষে সফলতার পর পাট চাষের এই সফলতা কৃষকদের  নতুন করে আশাবাদী করে তুলছে। এখন কৃষক লবণাক্ত জমিতে পাট ও আমন- দ’ুটি ফসলই চাষ করতে পারবেন। এমন একটি সময়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে পাট চাষের সফলতা এসেছে, যখন দেশে ১৭টি পাট পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতা মূলক করা হয়েছে। এতে যে অতিরিক্ত ২০ থেকে ২২ লাখ বেল পাটের চাহিদা তৈরী হয়েছে, তা দক্ষিণাঞ্চলে পাট আবাদের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে দেশের ভেতর ব্যবহার হয় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বেল এবং বাকি পাট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুসারে গত অর্থ বছরে ৯৬ কোটি ৪৮ লাখ ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পাট রপ্তানি হয়েছে ৯৬ কোটি ২৮ লাখ  মার্কিন ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৬ শতাংশ কম। তবে এর আগের বছর ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের  ২৮টি দেশে  আগামী বছর থেকে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কার্যকরী হবে। এতে বিশ্ব বাজারে পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। রবি-১ পাটের নতুন জাত বিশ্ববাজারের এসম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য ব্যবহার করতে হবে এবং দেশের পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পাটের নতুন উদ্ভাবনগুলির   কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক ব্যবহার ও পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। পাটের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে-পণ্যটির গুণগত মান ও আভ্যন্তরিন ব্যবহার বাড়ানো  এবং এর বহুমুখী  ব্যবহারসহ নতুন নতুন বিশ্ব বাজার অনুসন্ধানের কোনো বিকল্প নেই।

লেখকঃ

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ,

৪৫/১ হিন্দু পল্লী, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

মোবাইল: ০১৭২২৬৯৬৩৮৭

ইমেইল: netairoy18@yahoo.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare