হলুদ চাষাবাদের কলাকৌশল

কৃষিবিদ মোঃ সিরাজুল ইসলাম

 

হলুদের ইংরেজী শব্দঃ ঞঁৎসবৎরপ, হলুদের বোটানিক্যাল নামঃ ঈঁৎপঁসধ ফড়সবং:রপধ। পরিবারঃ তরহমরনবৎধপধব।

হলুদ বাংলাদেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মসলা ফসল। বাংলাদেশের এমন কোন ব্যঞ্চন নাই যাতে হলুদ ব্যবহার হয় না। মসলা হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও হলুদ নানাবিধ প্রসাধন সামগ্রী (ঈড়ংসবঃরপং) ও রং শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। ভেষজ চিকিৎসায় এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। খাদ্য হিসেবেও এটি বেশ উপকারী। এতে প্রচুর পুষ্টিমাণ রয়েছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী দেশে হলুদের উৎপাদন অনেক কম।

 

হলুদের ব্যবহারঃ হলুদ খাবারের রং কে যেমন বাড়ায় তেমনি খাবারের স্বাদও বাড়ায়। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান যেমন- গায়ে হলুদ, বিয়ে, পূজা ইত্যাদিতে হলুদের লক্ষণীয়। হলুদের ক্রীম বা হলুদ বাটা সৌন্দর্য চর্চায় ব্যবহার হয়। হলুদ ব্যবহারে খাবারের পঁচনশীলতা কমে। দেশের চাকমা, মারমা, তংচঙ্গা প্রভৃতি উপজাতি গোষ্টি সবজি হিসেবে হলুদের ফুল রান্না করে খায়। কক্সবাজার উপকূলের অধিবাসীরা হলুদের কচি পাতা ব্যঞ্জনের সাথে রান্না করে খায়। তাদের বাজার তালিকাতেও হলুদের কচি ডগার পাতার নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। হলুদ ব্যবহারে খাবারের পচনশীলতা কমে। প্রাকৃতিক রঙ হিসেবে আইসক্রিম, দই, কাস্টার্ড, ইয়োগার্ট, পানীয় জুস, কেক, বিস্কুটে হলুদ ব্যবহার করা হয়। কথিত আছে মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা তার সৌন্দর্য চর্চায় হলুদ ব্যবহার করতেন।

 

হলুদের রাসায়নিক উপাদানঃ হলুদের রাইজোমে থাকে ‘কারকিউমিন’ যা হলুদের রঙ তৈরী করে। এছাড়া একটি উদ্বায়ী তেল ‘টারমোরন’ হলুদের গন্ধ তৈরী করে।

 

হলুদ চাষের জলবায়ুঃ হলুদ উষ্ণ, অবউষ্ণ ও আদ্র জলবায়ুর ফসল। ছায়া, আধোছায়া, বৃষ্টিপাত সমৃদ্ধ পাহাড়ি অঞ্চলে হলুদ জন্মে। তবে প্রখর রোদযুক্ত জায়গায় বেশি কন্দ উৎপাদন হয়। কম তাপমাত্রায় বা ঠান্ডায় হলুদের বৃদ্ধি কমে যায়। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১০০-২০০ সে:মি: হলুদ চাষের জন্য ভাল। হলুদ ২০-৩০০ সে: তাপমাত্রায় ভাল জন্মায়। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৫০০ মিটার উচুঁতেও হলুদ জন্মে।

 

হলুদ চাষের মাটিঃ প্রায় সব ধরনের মাটিতেই হলুদ চাষ হয়। তবে পানি নিষ্কাশনযুক্ত বেলে দো-আঁশ থেকে পলি দো-আঁশ মাটিতে হলুদের ফলন বেশি হয়। প্রচুর জৈব পদার্থযুক্ত মাটি হলুদ উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। মাটির অম্ল বা চঐ ৫-৬ হলে ভাল হয়।

 

হলুদের জাতঃ  এ দেশে বেশ কিছু স্থানীয় জাতের হলুদ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাষ হয়ে আসছে। তবে এসব জাতের ফলন তুলনামূলক ভাবে কম। এদেশে উচ্চ পলনশীল (উফশী) জাত হিসেবে কয়েকটি জাত কৃষকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। তাই ক. স্থানীয় ও খ. উফশী উভয় জাতই চাষ হচ্ছে।

*            স্থানীয় জাতের হলুদঃ হরিনপলি বা হীরণ চোখা, আদাগতি, আড়ানি, মহিষবাট, বাঁশবাড়িয়া ও পাটনাই ইত্যাদি।

*          উফশী জাতের হলুদঃ বারি হলুদ-১ (ডিমলা), বারি হলুদ-২ (সুন্দরী), বারি হলুদ- ৩ ইত্যাদি। এই তিনটি উফশী জাতের মধ্যে বারি হলুদ ৩ জাতের রোগ বালাই কম হয়।

 

হলুদের উৎপাদন মৌসুমঃ বাংলাদেশে খরিপ মৌসুমে হলুদের চাষ হয়। মধ্য মার্চ হতে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত হলুদের কন্দ লাগানোর উত্তম সময়। দেরিতে হলুদ লাগালে শুধু গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে। মোথা বা হলুদ কম হয়।

 

জমি তৈরীঃ লাঙল বা পাওয়ার টিলার দিয়ে ভাল ভাবে ৪-৫টি চাষে জমি তৈরী করতে হয়। মাটি আগাছা পরিষ্কার করে মাটি ঝুরঝুরা করতে হবে। চাষের সময় গোবর বা জৈবসার ও অন্যান্য রাসায়নিক সার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।

 

হলুদের বীজ শোধন ও পরিমাণঃ হলুদকে কন্দ পঁচারোগ থেকে রক্ষার জন্য বীজ রোপণের পূর্বে কন্দ শোধন করে নিতে হবে। এজন্য প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ব্যাভিস্টিন বা রিডোমিল গোল্ড অথবা ডারথেন এম- ৪৫ ছত্রাক নাশক গুলে সেই পানিতে ২০ কেজি হলুদের কন্দ ৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। এরপর বীজগুলো পানি থেকে উঠিয়ে বাঁশের চাটির উপর দিয়ে ছায়ায় শুকিয়ে নিয়ে চাষকৃত জমিতে লাইন ধরে রোপণ করতে হবে। হলুদের বীজ হিসেবে কন্দ (জযরুড়সব), মোথা (ঈড়ৎস), কুশি  (ঋরহমবৎ) ব্যবহার করা যায়। বীজ হিসেবে কন্দকে কেটে টুকরা করা হয়। কিন্তু মোথা ও কুশি আস্ত লাগাতে হয়। প্রতিটি কন্দের ওজন ৩০-৪০ গ্রাম হওয়া বাঞ্চনীয়। প্রতি হেক্টরে ২-৩ টন কন্দের দরকার হয়। এক একরে লাগে ২৫-৩০ মন বীজ।হলুদের সার ব্যবস্থপনাঃ ভাল ফলনের জন্য হলুদের জমিতে প্রচুর জৈবসার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের উপর সারের পরিমান নির্ভর করে। হলুদ চাষের জন্য প্রতি হেক্টর জমিতে সার প্রয়োগের পরিমাণ সারণি আকারে দেখানো হলো।

 

বি:দ্র: ইউরিয়া ও এমওপি সার উপরে বর্ণিত সময়ের মধ্যে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। মাটিতে দস্তা ও বোরনের অভাব থাকলে হেক্টর প্রতি ৩.৫০ কেজি জিংক সালফেট ও ২ কেজি বোরিক এসিড দিতে হবে।

 

হলুদের অন্তর্বর্তিকালীন পরিচর্যাঃ

*           মালচিং : বীজ হিসেবে হলুদের কন্দ জমিতে রোপনের পর কন্দের উপর ৫-৭ সে: মি: পুরু করে লতা-পাতা বা ধানের খড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, একে মালচিং বলা হয়। মালচিং এর কারণে জমিতে রস থাকে এবং চাষের ফলে মাটি আলগা হয়ে যাওয়া বা ভূমি ক্ষয় রোধ হয়। এছাড়াও, কিছুদিন পর মালচিং পঁচে মাটিতে জৈব সার যোগ করে উর্বরতা বাড়ায়।

*           সেচ ব্যবস্থাপনাঃ মাটি শুষ্ক থাকলে বীজ বপনের পর পরই জমিতে সেচ দেয়া প্রয়োজন। জমি বেশী ভিজা থাকলে কন্দ পঁচে যেতে পারে, তাই জমিতে অতিরিক্ত পানি রাখা যাবে না। তবে পাহাড়ী হলুদে কোন সেচের প্রয়োজন হয় না। স্বাভাবিক বৃষ্টিতেই হলুদ ভাল হয়।

*           আগাছা দমনঃ হলুদ দীর্ঘমেয়াদী ফসল বলে হলুদের জমিতে ৪ বার নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। বীজ লাগানোর ৩-৪ দিন পর প্রথম আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। এরপর যথাক্রমে ৫০, ৮০, ১০০ ও  ১২০ দিন পর আগাছা নিড়ানি দিয়ে নিড়িয়ে দিতে হবে। সার উপরি প্রয়োগের পূর্বে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।

 

ভেলী বাঁধাঃ উপরি সার দেয়ার পর দুবারই গাছের গোড়ায় মাটি তুলে ভেলী বেঁধে দিতে হবে। এতে হলুদের ফলন ভাল হয়। তাছাড়া বৃষ্টির সময় পানি নিষ্কাশন সহজ হয়।

 

হলুদের রোগ লক্ষণ ও প্রতিকারঃ হলুদ গাছে পোকার চেয়ে রোগের আক্রমণ বেশী হয়। রোগের মধ্যে কন্দ পঁচা রোগ প্রধান। তবে পাহাড়ী অঞ্চলে সম্প্রতি পাতা ঝলসানো রোগও ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। পোকার মধ্যে হলুদ গাছের ডগা ছিদ্রকারী পোকা অম্যতম।

*           হলুদের কন্দপচাঁ রোগঃ হলুদে প্রায়ই হয়ে থাকে, এটি ছত্রাকজনিত রোগ। লক্ষণঃ প্রথমে গোড়ার পাতা হলুদ হয়ে পড়ে, উপরের পাতাও হলুদ হয়ে যায়। শেষে কন্দ পঁচে মোথা নিচু হয়ে দুর্গন্ধ বের হয়। আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্রই ধ্বংস করতে হবে এবং ব্যাভিষ্টিন/রিডোমিল গোল্ড/ডায়থেন এম ৪৫ ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।

*          পাতা ঝলসানো (খবধভ নষড়ঃপয) রোগঃ এটি হলুদ গাছের ছত্রাকজনিত রোগ।

লক্ষণ: এ রোগের ফলে পাতার দু-পাশে ছোট ছোট অসংখ্য দাগ পড়ে। পরে দাগগুলো ক্রমে এক হয়ে পাতা ঝলসে শুকিয়ে ঝরে পড়ে। আক্রান্ত গাছ জমি থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রোগ বেশি হলে ফেলিকুর ১০ মিলি বা ২০ গ্রাম ডারথেন এম ৪৫ ছত্রাক-নাশক প্রতিলিটার পানিতে গুলে ১৫ দিন পর পর ৩ বার পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।

*           পাতার দাগ (খবধভ ংঢ়ড়ঃ) রোগঃ এটিও ছত্রাকজনিত হলুদ গাছের রোগ। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে এই রোগ দেখা যায়।

লক্ষণ: প্রথমে পাতায় ধূসর কেন্দ্র বিশিষ্ট বাদামি দাগ দেখা যায়। পরে দাগগুলো একত্রে মিশে বড় হয় ও পাতাকে পুড়িয়ে ফেলে। আক্রান্ত পাতা তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কার্যকরী ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।

*          ডগা ছিদ্রকারী পোকাঃ পোকা দ্বারা আক্রান্ত গাছের পাতার ডাটার বা খোলে ছোট ছিদ্র দেখা যায়। ভেতরে পোকা থাকে যা ডগা ছিদ্রকরে কন্দও ছিদ্র করে ফেলে। ফলে ডগা শুকিয়ে মরে যায়। আক্রান্ত ডগা ছিড়ে পোকা মেরে ফেলতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে পারফেকথিয়ন ৪০ ইসি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

হলুদের রোগের সাধারণ প্রতিকারঃ ক. বীজের জন্য রোগমুক্ত গাছ হতে কন্দ নিতে হবে, খ. আক্রান্ত জমিতে পর পর হলুদ চাষ করা যাবে না, গ. ফসলের জমি শুকনোবস্থায় রাখতে হবে।

 

হলুদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণঃ বপনের ৯-১০ মাস পর গাছের পাতা যখন হলদে রং ধারণ করে শুকিয়ে যায় ঠিক তখনই হলুদ সংগ্রহের সময়। জানুয়ারির শেষ হতে মার্চের প্রথম পর্যন্ত হলুদ সংগ্রহ করা হয়। যথা সময়ে হলুদ সংগ্রহ করা না হলে হলুদের ‘কারকিউমিন’ রং কমে যায়। লাঙ্গল বা কোদাল দিয়ে খুব সতর্কতার সাথে জমি খুড়ে হাত দিয়ে হলুদ সংগ্রহ করা হয়। হলুদে লেগে থাকা মাটি, গাছের পুরানো পাতা ও কান্ড আলাদা করা হয়। এরপর শিকড় কেটে মোথা ও ছড়া (কুশি) আলাদা করা হয়। ভালভাবে পরিষ্কারের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে পানি ব্যবহার করতে হবে।

হলুদের পরিষ্কারকৃত মোথা ও ছড়াকে পরিচ্ছন্ন ছায়াযুক্ত স্থানে গাঁদা করে রেখে পরিষ্কার পাতা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ২-৩ দিনের মধ্যে হলুদ থেকে উৎপন্ন ঘাম ঝরে যাবে। এই প্রক্রিয়াকে হলুদের ঘাম ঝরানো বা সুয়েটিং (ঝবিধঃরহম) বলে।

হলুদের মোথাকে বীজ হিসেবে রাখা হয়। ছড়াকে বীজ হিসেবে ব্যবহার করলে ফলন কম হবে। আকাড়ে বড়, মাংসল ও সুস্থ হলুদ বীজ হিসেবে রাখা হয়। ৩ বারে হলুদ বীজ সংরক্ষণ করা হয়। ক. ছত্রাকনাশক  এবং বালাইনাশকে ৩০ মিনিট ডুবিয়ে রেখে ছায়ায় শুকাতে হয়। খ. ১ ১ ১ মি: মাটিতে গর্ত করে হলুদ সংরক্ষণ করলে বেশি দিন ভাল থাকে। গর্তের ভেতরের চারপাশে খড় বিছিয়ে মাটি চাপা দিয়ে গর্ত বন্ধ করে দিতে হবে। তবে গর্তের গভীরতা বেশী হলে হলুদ পঁচে যেতে পারে। গ. বাতাস চলাচল করে এমন ঘরে গাদাকরে উপরে হলুদের পাতা দিয়ে ভালভাবে ঢেকে দিতে হবে। এ ছাড়াও বালু দিয়ে ঢেকে দিয়ে সংরক্ষণ করা যায়।

উফশী জাতের হলুদ চাষ করলে হেক্টর প্রতি ২৫-৩০ টন হলুদ পাওয়া যায়। ১০০ কেজি কাঁচা হলুদ হতে ২৫-৩০ কেজি শুকনা হলুদ পাওয়া যায়। হলুদ গাছ ছায়া সইতে পারে বলে বাড়ির আঙ্গিনায়, ফল বাগানে এর চাষ করা যায়। আমবাগান, নারিকেল বাগান, লেবু গাছের নিচে হলুদ চাষ করা যায়। পাহাড়ে হলুদের সাথে শিমুল আলু, ভূটা, কাউন, চুকুর ইত্যাদি লাগানো হয়।

—————————————-

লেখকঃ কৃষিবিদ, গীতিকার, ছড়াকার ও লেখক, রীতা হোমিও হল, পালপাড়া (জামে মসজিদের সামনে), বাজিতপুর বাজার, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১২-১৫৫০১৪,

০১৮৫০-০৬৪১৩০।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *