হলুদ : রোগ নিরাময়ে প্রয়োগ ও ব্যবহার

কৃষিবিদ মোঃ সিরাজুল ইসলাম

15548746_xl

মসলা জাতীয় ফসলের তালিকায় শীর্ষ ব্যবহারযোগ্য ফসলের মধ্যে হলুদ অন্যতম। কাঁচা হলুদ থেকে শুরু করে গুঁড়া হলুদের ব্যবহার ব্যাপক। নিত্য খাবার ব্যঞ্জনের রঙ করার উদ্দেশ্যেই প্রধানত: এর ব্যবহার হয়ে থাকে তা নয়। শারীরিক প্রয়োজনে হলুদের ব্যবহার হয়ে থাকে তা নয়; শারীরিক প্রয়োজনে হলুদে ব্যবহার হয়ে থাকে। শুধু মাত্র হলুদ দিয়েই রোগ নিরাময়ে বহুমাত্রিক ব্যবহার সম্ভব। হলুদের বোটানিকাল নামঃ ঈঁৎপঁসধ ফড়সবং:রপধ, পরিবারঃ   তরহমরনবৎধপধব।

নি¤েœ সংক্ষেপে হলুদের রোগ নিরাময়ে প্রয়োগ ও ব্যবহার তুলে ধরা হলো :

১. মুখের রং উজ্জ্বল্যেঃ হলুদের এক নাম ‘হরিদ্রা’; আর এক নাম ‘বর্ণ বিধারণী’। মুখের লালিত্য বজায় রাখার জন্য মাসুর ডাল ও কাঁচা হলুদবেটে দুধের সর মিশিয়ে মুখে ও হাতে মাখতে হবে। ২ ঘন্টা পর ধুয়ে ফেলুন। ১ মাস প্রযোজ্য।

২. ব্রন নিরাময়েঃ সকালে খালি পেটে ২ টুকরো কাঁচা হলুদ ও ২টা নিমপাতা একসঙ্গে (আঁখের গুড় সহ) মিশিয়ে খেলে ব্রন সেরে যায় আবার দেহের রঙও উজ্জ্বল হয়।

৩. পেটের ক্রিমিঃ হলুদের এক নাম ক্রিমিনাশকারী। বয়সের তারতম্য অনুযায়ী ১৫-২০ ফোঁটা কাঁচা হলুদের রস ছেঁকে নিয়ে তাতে অল্প লবণ মিশিয়ে সকালে খালিপেটে ৭দিন খেতে হবে।

৪. প্রমেহ রোগেঃ প্রস্রাবের জ্বালার সঙ্গে পূঁজের মতো লালা নির্গত হলে, কাঁচা হলুদের রস ১ চা-চামচ একটু মধু বা চিনি মিশিয়ে ২/৩ সপ্তাহ খেতে হবে। এমনকি এর দ্বারা অন্যান্য প্রকার প্রমেহ রোগেরও উপশম হয়ে থাকে।

৫. গায়ের রঙ উজ্জ্বল করতেঃ কাঁচা হলুদ, কমলালেবুর খোসা ও নিমপাতা একসঙ্গে পানি দিয়ে বেটে গয়ে মেখে এক ঘনটা পর ধুয়ে ফেললে গায়ের রঙ উজ্জ্বল হয় এং চর্ম রোগ প্রতিরোধ হবে। এটা সপ্তাহে অন্ততঃ ৩-৪ দিন লাগাতে হবে।

৬. শরীরের দাগ উঠাতে : গায়ে হাম বসন্ত বা চুলকানির দাগ থাকলে কাঁচা হলুদ ও নিমপাতা একত্রে বেটে কয়েকদিন লাগালে দাগ উঠে যাবে ও চামড়া ফর্সা হবে।

৭. স্বর ভঙ্গেঃ কোন সাধারণ কারণে গলা বসে স্বর রুদ্ধ হয়ে গেলে ২ গ্রাম পরিমাণ হলুদ গুড়াঁর সরবত চিনি মিশিয়ে একটু গরম করে ১ ঘন্টা পরপর ৪-৫ বার খেলে চমৎকার উপকার হয়।

৮. ফোড়া পাকাতে ও শুকাতেঃ হলুদ আগুনে পুড়িয়ে পোড়া ছাই সামান্য পানিতে গুলে ফোড়ায় লেপে দিতে হবে। এতে ফোড়া পেকে গিয়ে ফেটে যাবে। এরপর গুঁড়ো হলুদ সামান্য পানিতে গুলে প্রলেপ দিলে ফোড়া শুকিয়ে যাবে। অথবা সামান্য হলুদের সাথে সামান্য চুন মিশিয়ে গরম করে চিমটি পরিমাণ ফোড়ার মাথায় লাগালে ফোড়া ফেটে রক্ত ও পূূঁজ বের হয়ে ব্যাথা কমে যায়।

৯. মচকে গেলেঃ দেহের কোন অংশ মচকে গেলে ১ ভাগ লবণ, ২ ভাগ চুন ও ৪ ভাগ হলুদ বাটা একত্রে ভালো করে মিশিয়ে গরম করে চোটের জায়গায় ২-৩ দিন লাগাতে হবে।

১০. লিভার বা যকৃতের দোষেঃ ১ চামচ কাঁচা হলুদের রস (বা”চাদের জন্য ৫-৬ ফোঁটা) সামান্য চিনি অথবা মধুসহ খেতে হবে অন্ততঃ ১ মাস।

১১. গলা ধরে গেলেঃ চিৎকার, বক্তব্য বা গান যে কোন কারনে গলা বসে গেলে ১ গ্লাস গরম পানিতে মাত্র ২ গ্রাম হলুদের গুঁড়া ও ২ চা-চামচ চিনি মিশিয়ে সরবত করে কয়েক বার খেতে হবে।

১২. তোত্লামিতেঃ ছোটবেলায় যাদের কথা আটকে যায়, অথবা তাড়াতাড়ি কথা বলার জন্যে তোত্লামি দেখা দিলে কাঁচা হলুদ ভালভাবে রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে ১ চামচ পরিমাণ নিয়ে ১ চামচ ঘিয়ে ভেজে সারাদিনে ২/৩ বার খেতে হবে।

১৩. এ্যালার্জি বা আমবাতেঃ খাদ্য বিশেষে অনেকের দেহে চাকাচাকা হয়ে ফুলে উঠে, চুলকায়, লাল বা গোলাপী রঙ ধারন করে- যাকে বলা হয় আর্টিকোরিয়া বা আমবাত। এ ক্ষেত্রে নিমপাতার গুঁড়ো ১ ভাগ, কাঁচা হলুদ শুকানো গুঁড়ো ২ ভাগ এবং শুষ্ক আমলকি গুঁড়ো ৩ ভাগ একসঙ্গে মিশিয়ে ১ গ্রাম মাত্রায় সকালে খালি পেটে ২ সপ্তাহ খেলে শীঘ্রই অসুবিধাগুলো নিরাময় হবে।

১৪. চোখ উঠলেঃ হলুদ থেতো পানিতে অর্থাৎ হলুদ গুঁড়ো করে পানিতে ভিজিয়ে চেঁকে নিয়ে ঐ রসে চোখ ধোতে হবে এবং ঐ রসে ছোপানো ন্যাকড়ায় চোখ মুছতে থাকলে চোখের লালাও কেটে যাবে এবং চোখ তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে যাবে।

১৫. হাঁপানীতেঃ হলুদ গুঁড়ো ১ চামচ, আখের  (ইক্ষু) গুড় ১ চামচ ও খাঁটি সরিষারতেল ১ চামচ একত্রে ভালভাবে মিশিয়ে জিহবা দিয়ে মাঝে মাঝে চেটে খেলে উপশম হয়ে কিছুটা আরাম হয়।

১৬. জোঁক ধরলেঃ কখনও জোঁকে ধরলে জোঁকের মুখে হলুদ গুঁড়ো দিলে সাথে সাথে জোঁক পড়ে যাবে এবং রক্ত বন্ধ হবে। উল্লেখ্য যে, জোঁক কোন প্রাণির গায়ে কামড় বসানোর সময় হায়াসিন নামক হরমোন প্রয়োগ করে যাতে রক্ত বন্ধ না হয়।

১৭. অতিরিক্ত পানি পিপাসায়ঃ অনেকের অতিরিক্ত পানি পিপাসা হয়। ক্ষেত্রে ৫-৭ গ্রাম কাঁচা হলুদ থেতো করে গেড় কাজ আন্দাজ পানিতে ৫-১০ মিনিট সেদ্ধ করে, ছাঁকনিয়ে সে পানিতে অল্প চিনি মিশিয়ে ১ চামচ করে মাঝে মাঝে খেলে এ সমস্যা চলে যাবে।

১৮. ফাইলোরিয়া বা গোদ রোগেঃ মশা  বাহিত পরজীবী দ্বারা এই রোগ ছড়ায়। এক্ষেত্রে কাঁচা হলুদের রস ১ চামচ ও সমপরিমাণ আখের (ইক্ষু) গুড় মিশিয়ে প্রায় ১৫ দিন খেলে উপকার হবে।

১৯. চুলকানি নিরাময়েঃ কাঁচা হলুদ বাটা ও নিমপাতা বাটার সাথে কয়েক ফোঁটা সরিষার তেল মিশিয়ে গোসলের পূর্বে শরীরে লাগিয়ে একটু অপেক্ষা করে ৩-৪ দিন গোসল করলে চুলকানি চলে যাবে।

২০. আথ্রাইটিস বা অস্থিসন্ধির  প্রদাহ সারাতেঃ কাঁচা হলুদে আছে কারকামিন নামক রাসায়নিক পদার্থ। এই উপাদানটি প্রদাহ নিরোধক ক্ষমতার অধিকারী। প্রতিদিন সকাল বেলা আখের গুড়ের সাথে কাঁচা হলুদ খেতে থাকলে উক্ত প্রদাহ সারতে সহায়তা করে।

২১. ক্যান্সার প্রতিরোধেঃ আধুনিক গবেষণায় জানা গেছে, কাঁচা হলুদের কারকামিন নামক উপাদানের ক্যান্সার নিরোধী ক্ষমতা আছে। কারকামিন টিউমারের কোষকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে বাধা প্রদান করে থাকে। প্রতিদিন অন্ততঃ ২ বা একটুকরা কাঁচা হলুদ খেলে উপকার পাবেন।

২২. পেটের গোলমালেঃ ১ টেবিল- চামচ হলুদ গুঁড়ো; ১ চা-চামচ সরিষার তেল, একটি মাঝারি আকারের পিয়াঁজ ও প্রয়োজন মতো লবণ একত্রে ভাজি করতে হবে। গরম ভাতের সাথে তৃপ্তি সহকারে খেতে হবে।  প্রয়োজনে আরো একবার খেতে হবে। অন্য কোন তরকারি খাওয়া চলবে না। এতেই পেটের গোলমাল চলে যাবে।

২৩. যকৃত ও হৃদপিন্ডকে রক্ষা করতেঃ গবেষণায় জানা গেছে হলুদের রয়েছে রক্ত জমাট বিরোধী উপাদান, যা রক্তনালীর ভেতরের রক্ত জমাট বাঁধাদান করে। তাই হলুদ ব্যবহারে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

২৪. কোলেস্টেরল কমাতেঃ হলুদ রক্তের কোলেষ্টেরলের মাত্রা কমাতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। যাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি তারা অবশ্যই প্রত্যহ সকালে দু-টুকরো কাঁচা হলুদ খাবেন।

২৫. ব্যাকটেরিয়া বিস্তারে বাধা সৃষ্টিঃ ত্বকের কোন রকম ঘা বা ক্ষতে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করলে সেখানে হলুদের প্রলেপ দিলে হলুদ ব্যাকটেরিয়ার চারদিকে শক্ত আবরণ সৃষ্টি করে যা এদের বৃদ্ধি ও বংশ বিস্তার করতে বাধা দান করে। হলুদের ব্যাকটেরিয়া নিরোধী গুণাবলীর জন্য ক্ষতস্থান ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হতে রক্ষা পেয়ে থাকে।

২৬. খাদ্য পরিপাক ও অন্ত্রের পরজীবী বিনাশ করেঃ হলুদ পিত্তকে সহজেই পিত্তরস নি:সরণে উদ্দীপ্ত করে। পিত্তরস নি:সরণে সহায়তা করার মাধ্যমে হলুদ খাদ্য পরিপাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেণষণায় দেখা গেছে যে, হলুদ  প্রোটোজোয়া নামক এককোষী পরজীবীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

২৭. বাইরের আক্রমণ থেকে পঁচনশীল বস্তুকে রক্ষা করেঃ মাছ, মাংস ও শুঁটকিজাতীয় বস্তুকে প্রক্রিয়াজাত করার পূর্ব সময়ে হলুদ ও লবণ মিশিয়ে নিলে টাটকা ও বিশুদ্ধ রাখা যায়। বিশেষ করে মাছ ও মাংস শুটকী করার সময় হলুদ ও লবণ মিশিয়ে রোধে শুকাতে দিলে মাছি ডিম পাড়ে না।

সুতরাং- হলুদ বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবহার ও খেলে অসংখ্য উপকার পাওয়া যাবে।

সাবধানতাঃ লিভারে যাদের সমস্যা আছে বা লিভারের রোগ হওয়ার ঝুঁকি আছে তারা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হলুদ খাবেন। বেশি হলুদ গ্রহণ তাদের জন্য ক্ষতিকর। ল্যাক্টোস ইনটলারেন্ট হলে দুধের সঙ্গে হলুদ মিশিয়ে খাওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে দুধ বাদ দিয়ে মধু, সয়া দুধ অথবা শুধু হলুদ অল্প পরিমাপে খাওয়া যাবে। দুরারোগ্য কোন লিভারের অসুখ হলে হলুদ যতটা পারা যায় এড়িয়ে চলতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ত্বকে সহ্য না হলে হলুদের ব্যবহার বাদ দিন। একাধারে দীর্ঘদিন কাঁচা হলুদ না খেয়ে মাঝে মধ্যে বিরতি দিতে হবে। পরিমাণ মতো হলুদ খেতে হবে। অতিরিক্ত হলুদ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।

—————————————-

লেখকঃ কৃষিবিদ, গীতিকার, ছড়াকার ও লেখক

রীতা হোমিও হল, পালপাড়া (জামে মসজিদের সামনে)

বাজিতপুর বাজার, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১২-১৫৫০১৪,

০১৮৫০-০৬৪১৩০।

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare