১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষিবিদ দিবস ও প্রাসঙ্গিক কথা

মো. বশিরুল ইসলাম

কৃষিতে পড়ালেখা করে বুঝতে পারলাম, এ দেশের মানুষকে সত্যিকার অর্থে কোনো পেশার লোক যদি বেশি কিছু দিয়ে থাকে, তারা হলেন কৃষিবিদ। ৭ কোটি মানুষের দেশে খাদ্যের অভাব ছিল, আজ ১৭ কোটি মানুষ ভালোমতোই খেতে পারছে। একসময়ের খাদ্য ঘাটতির দেশ, এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। খাদ্যসহ নানা ধরণের শাকসবজি রফতানি করে দেশ প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। এ বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে কৃষিবিদ তথা কৃষিবিজ্ঞানী কর্তৃক উদ্ভাবিত নতুন নতুন কৃষিপ্রযুক্তি ও অধিক উৎপাদনশীল জাতের বীজ ব্যবহার করে কৃষক আজ ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিয়ে চলেছে। আমরা যদি অন্যান্য পেশার সঙ্গে কৃষি পেশাকে তুলনা করি, তাহলে দেখব কৃষিবিদদের গবেষণা সরাসরি দেশ উন্নয়নে কাজ করছে বলে আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।

আমাদের এদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে খুঁজে পেতে কষ্ট হলেও কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আজ বিশ্বদরবারে একটি রোলমডেল। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) তথ্যানুযায়ী, চাল ও মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, সবজিতে তৃতীয় এবং আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন সপ্তম স্থানে। শুধু কি তা-ই, বর্তমানে ব্ল্যাকবেঙ্গল ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, পাট রপ্তানিতে প্রথম, ধান আর চা উৎপাদনে চতুর্থ, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম। এ দেশ থেকে আলু, সবজি আর আম রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। এগুলো হচ্ছে গর্বিত ইতিহাস, কৃষিক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সফলতার ইতিহাস। এই ইতিহাস সৃষ্টির পিছনে কৃষিবিদদের অবদান আজ উল্লেখ্য করা মতোই।

কৃষিবিদরা কৃষির উৎকর্ষের জন্য গবেষণা করেন, গবেষণা থেকে উদ্ভাবিত হয় নতুন প্রযুক্তি, আর সে প্রযুক্তি মাঠে সম্প্রসারণও করেন কৃষিবিদরা। কৃষিবিদদের হাতেই সৃষ্টি হয় ফসলের নতুন জাত কিংবা ফসলের উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি। শুধু ফসল কেন, ফসলের পাশাপাশি গবাদিপশুর উন্নয়ন, দুধের মান ও পরিমাণ বাড়ানো, মাংসের জন্য উন্নত জাতের পশুপালন প্রযুক্তি, বিভিন্ন ধরণের মাছের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি খামারের বিভিন্ন প্রকার যান্ত্রিকীকরণ, কিংবা কৃষির সব ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণÑ এ সবই কৃষিবিদদের হাতের স্পর্শে প্রাণ পায়; উজ্জীবিত হয় সংশ্লিষ্ট সবাই। এভাবেই ঘুরে দাঁড়ায় এ দেশের মেরুদন্ডখ্যাত কৃষকের অর্থনৈতিক অবকাঠামো।

একসময় কৃষক যেমন শোষণ আর বঞ্চনার শিকার হতেন, তেমনই কৃষকের অকৃত্রিম বন্ধু কৃষিবিদরাও সামাজিক অবহেলা তথা অমর্যাদার শিকার হতেন। স্বাধীনতার আগে স্নাতক শেষ করে চাকরিতে যোগদানের সময় কৃষিবিদদের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হতো। ফলে স্বাধীনতার আগে থেকেই চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীদের মতো কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার মর্যাদা দেওয়ার দাবি ওঠে। এ সময় দাবি আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে মারা যান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মলয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খুব ভালো করেই জানতেন, কৃষিপ্রধান দেশে কৃষির সম্পূর্ণ বিকাশ ও উৎকর্ষ ব্যতিরেকে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। অবশেষে সেই আন্দোলনের সফল সমাপ্তি হয়েছে জাতির জনকের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, ঐতিহাসিক ঘোষণার মাধ্যমে। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে আখ্যায়িত করে পে-স্কেল সংশোধনের ব্যবস্থা করেন। এর পর থেকে প্রথম শ্রেণির সুবিধাগুলো পে-স্কেলের মাধ্যমেও স্বীকৃত হয়। এর ফলশ্রুতিতে কৃষিবিদরা যেমন সম্মানিত হয়েছেন, তেমনি দেশে কৃষিরও ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর কন্যার হাতে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আবাদি জমি দিন দিন কমার পরও জনসংখ্যা দ্বিগুণ বাড়লেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ। সেদিন এ ঘোষণা না হলে অর্থাৎ কৃষিবিদদের পদমর্যাদা উন্নত না হলে আজও এ দেশের কৃষি থাকত সেই তিমিরেই। কারণ সে মর্যাদা পেয়েই দেশের উৎকৃষ্ট এবং মেধাবী সন্তানরা এসেছে কৃষি শিক্ষায়।

কালের পরিক্রমায় কৃষি গ্র্যাজুয়েটরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মোতাবেক দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। যদিও ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আবারও দ্বিতীয় শ্রেণিতে রূপান্তরের চেষ্টা চালালে কৃষিবিদসহ দেশবরেণ্যরা এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেননি। এমনকি যারা ক্ষমতায় আসেন তারা আবার কৃষিবিদদের অবমূল্যায়ন করার চেষ্টা করেন। এর পর বিভিন্ন ধারার রাজনীতির ডামাডোলে এ বিশেষ দিনটিকে মনে করার কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি। অবশেষে ‘কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ’ এর তৎকালীন মহাসচিব ও সাবেক সংসদ সদস্য কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের একান্ত চেষ্টায় ১৩ ফেব্রুয়ারিকে ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই সঙ্গে ২০১১ সাল থেকে যথাযোগ্য মর্যাদায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটিকে কৃষিবিদ দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের সুপ্রারিত কৃষিনীতি, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাণিজ্যিক কৃষি উন্নয়ন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং উন্নয়নসহ কৃষির আধুনিকীকরণ, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে গবেষণা সুবিধা বৃদ্ধিসহ নানামুখী পদক্ষেপের কারণে কৃষিতে ঘটছে নীরব বিপ্লব। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম। আরও কত নিত্যনতুন সফলতার হাতছানি আমাদের ডাকছে শুভ সুন্দর আগামীতে। সবই কৃষিবিদদের ঐকান্তিক চেষ্টার সফলতা পেয়েছে।

সরকারের ডিমওয়ালা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জাটকা নিধন নিষিদ্ধকরণের নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে এখন ইলিশের উৎপাদন বহুল পরিমাণে বেড়েছে। চিংড়ি রফতানি থেকে প্রতি বছর আমাদের আয় ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া পুষ্টির অন্যান্য উৎপাদন ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদনও বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাতে বৃদ্ধি পেয়েছে এসব পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের জনপ্রতি প্রাপ্যতা।

আজ আমাদের কৃষি সাফল্যের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। তা হচ্ছে, আমাদের কৃষকরা বছরের পর বছর তাদের বহু কষ্টে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। কোনো ভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কৃষি পণ্যের সঠিক মূল্য। তাছাড়া প্রতি বছর একশতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে চাষাবাদ তথা খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন হয়তো উন্নতমানের  প্রযুক্তি এবং উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার করেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখা সম্ভব হবে না। তাহলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে। এজন্য এখন থেকেই যথাযথ পরিকল্পনা প্রহণ একান্ত জরুরি হয়ে উঠেছে বলে আমি মনে করি।

এছাড়া, আমাদের দেশের অনেক যোগ্য ও প্রথিতযশা গবেষক কৃষিকাজে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ভালো ফলও পাচ্ছেন। কিন্তু দেখা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গবেষণার ফল জার্নাল বা পাবলিকেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। আমাদের গবেষকদের এ অর্জনগুলো তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যাক, সেই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্যের জোগান নিশ্চিতের মাধ্যমে কৃষিবিদরা সুস্থ, সবল ও মেধাবী জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। এতে উপকৃত ও উন্নত হবে এ দেশ। আর কৃষিবিদরা হয়ে থাকবেন জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

পরিশেষে, সরকারে কাছে আকুল আবেদন এ দিবসটিকে জাতীয়ভাবে পালন করা উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।

————————————-

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

মোবাইল-০১৭১৬-৫৮১০৮৬

ইমেইল-mbashirpro1986@gmail.com

FacebookTwitterGoogle GmailEmailYahoo MailYahoo MessengerShare